পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতি: ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিভাজন

Send
জিয়াউল হক, রাঙামাটি
প্রকাশিত : ০৪:০০, এপ্রিল ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩০, এপ্রিল ০৩, ২০১৮

শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করলেও এক বছরের মাথায় চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গঠিত হয় ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’। শান্তির সুবাতাসের বদলে পাহাড়ের আবারও শুরু হয় রক্তের খেলা। শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। এরপর ২০০৭ সালে ‘জনসংহতি সমিতি’ থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)’। এতদিন এই দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গেলেও সবশেষ গত বছরে আত্মপ্রকাশ করে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক দল ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’। এই চার সংগঠনের ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়।

মূলত পাহাড়ের আঞ্চলিক আধিপত্য ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এদের মধ্যে বৈরিতা থাকলেও চার দলই একে আদর্শের সংঘাত বলে দাবি করে থাকে। অবশ্য তাদের এই দাবি বিশ্বাস করার লোক পাহাড়ে হাতেগোনা।

এতদিন মূল লড়াইটা হতো জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে। গত ১২ বছরে পাহাড়ের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খাগড়াছড়ির প্রায় পুরোটার নিয়ন্ত্রণ ইউপিডিএফের হাতে। বালাঘাটা ও নাইক্ষ্যংছড়ির কিছু এলাকা ছাড়া বান্দরবানের পুরোটাই জনসংহতির একক নিয়ন্ত্রণে। আর রাঙামাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন সময় দখল-পাল্টা দখল চলেছে।

রাঙামাটির নানিয়ারচরে শুরু থেকেই ইউপিডিএফের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল। বাকি প্রায় সব উপজেলা জনসংহতির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালে রাঙামাটিতে একের পর এক উপজেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ইউপিডিএফ। এমনকি রাঙামাটি শহরেও একাধিকবার বিশাল শোডাউন করে সংগঠনটি। সেই সময় ধারণা করা হচ্ছিল, সম্ভবত রাঙামাটি শহরের নিয়ন্ত্রণও নিতে যাচ্ছে সংগঠনটি। শহরের রিজার্ভ বাজারে নিজেদের নতুন অফিস নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে তারা। কিন্তু জরুরি অবস্থা শেষ হতেই পাল্টা আঘাত হানে জনসংহতি সমিতি। ইউপিডিএফের কাছ থেকে একের পর এক উপজেলার পুনর্নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তারা। তছনছ হয়ে যায় ইউপিডিএফের 'নতুন সাম্রাজ্য' রাঙামাটি।

প্রতিষ্ঠার পর এখন বেশ খানিকটা নাজুক ইউপিডিএফ। গত কয়েক মাসে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মী খুন, গ্রেফতার ও মামলার ভয়ে পলাতক থাকার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ইউপিডিএফের সাংগঠনিক অবস্থা আর আগের মতো নেই।

এখন পাহাড়ের রাজনীতির নতুন মেরুকরণ হয়েছে। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) অনেকটা এক হয়ে আন্দোলন করছে। আবার এতদিন জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও সম্প্রতি এই দুই দলের মধ্যেও দ্বন্দ্ব কমে এসেছে বলে জানিয়েছেন একাধিক নেতাকর্মী। বিলাইছড়িতে দুই মারমা বোনের ধর্ষণ ঘটনার বিচারের দাবিতে শহরে মানববন্ধন করে ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন। বছরদুয়েক আগে কল্পনা চাকমা অপহরণের বিচার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করতে চাইলে পিসিপি নেতাকর্মীরা এসে ব্যানার কেড়ে নিয়ে মানববন্ধন পণ্ড করে দেয়।

ইউপিডিএফের মুখপাত্র নিরন চাকমা বলেন, ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতেই মুখোশ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। তারা পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নয়, তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য মুখোশ বাহিনী গঠন করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের দুই সহযোদ্ধাকে কারা নিয়ে গেছে, সেটা স্থানীয় লোকজন দেখেছে। দিনদুপুরে এভাবে নিয়ে যাওয়ার পর তারা তা অস্বীকার করতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘সংস্কার (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, এমএন লারমা) ও মুখোশ বাহিনী (ইউপিডিএফ, গণতান্ত্রিক) এরা দুই দল এক হয়ে এসব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চাচ্ছে এই এলাকা থেকে আমাদের বিতাড়িত করতে। তাদের নিজের মধ্যে সমঝোতা আছে। আমার মনে হয়, তারা কারও দ্বারা পরিচালিত।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সহ-সভাপতি ও নানিয়রচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা বলেন, ‘তাদের সাংগঠনিক ব্যর্থতার কারণে ইউপিডিএফ ভেঙে নতুন সংগঠন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। এতে আমাদের বিভিন্ন সময় দোষারোপ করা হচ্ছে, এটি ঠিক নয়। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) আত্মপ্রকাশের কারণে অনেকটা দেউলিয়া হয়ে গেছে ইউপিডিএফ। আমরা কারও সঙ্গে এখনও সমঝোতা করিনি।’

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের মুখপাত্র লিটন চাকমা বলেন, ‘আমরা কী কারণে দল ছেড়ে নতুন দল গঠন করলাম সেটি জানার চেষ্টা কেউ করেনি। আমরাও ইউপিডিএফের ছিলাম। পার্টির ভেতরের অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে আমরা ৬২ জন বেরিয়ে এসেছি। একসময় জেএসএস, ইউপিডিএফ ও এমএন লারমা (জেএসএস) এর মধ্যে সমঝোতা হয়, কেউ কাউকে গুলি করবে না। যে যার এলাকায় আছে সেখানেই থাকবে। দীর্ঘ ৩ বছর আমরা চুপচাপ ছিলাম, কিন্তু এর মধ্যে আমাদের ১১ জনকে তারা হত্যা করেছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যেহেতু দল আছে, সেহেতু আমাদের স্বাধীনতা আছে। কেউ যদি আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তা তো চলবে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মধ্যে গতবারের মতো সমঝোতা হতে পারে। এখন দেখার বিষয় কী হয়।’

তবে এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-তথ্য প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ‘এখনও এই বিষয়ে কথা বলার সময় আসেনি।’ 

 

/এএম/

লাইভ

টপ