নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে শ্রমিক সংকটে ধানকাটা ব্যাহত

Send
হানিফ উল্লাহ আকাশ, নেত্রকোনা
প্রকাশিত : ১৯:০০, এপ্রিল ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০২, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

মাঠজুড়ে পাকা ধান (ছবি- প্রতিনিধি)

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে শুরু হয়েছে বোরো ধান কাটা। হাওরজুড়ে এবার বোরোর বাম্পার ফলন হওয়ায় খুশি চাষি। স্থানীয় কৃষি বিভাগেরও দাবি, এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় হাওরের বোরো আবাদ ভাল হয়েছে। তবে এবার ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে চাষিরা কিছুটা বিপাকে পড়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, গত বছরের বন্যায় খালিয়াজুরি উপজেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনেকেই ঘরবাড়ি ছাড়েন। আর্থিক অনটনের জন্য বোরো আবাদও করেননি এ উপজেলার অনেকে। জীবিকার তাগিদে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর শহরের কল-কারখানায় কাজে লেগে যাওয়ায় এবার হাওরে দেখা দিয়েছে শ্রমিক সংকট।

স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে একলাখ ৮১ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরিবেশ অনুকূল থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টরের মতো বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে।

সূত্র জানায়, জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা ও বারহাট্টার কিছু অংশ নিয়ে হাওরাঞ্চল। জেলায় সব মিলিয়ে ছোট-বড় ১৩৪টি হাওর রয়েছে। এর মধ্যে খালিয়াজুরীতেই আছে ৮৯টি হাওর। এ ছাড়া, হাওরের ফসল রক্ষায় ২৭১ দশমিক ৮৪ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ রয়েছে। ওই বাঁধের ওপর স্থানীয় কৃষকদের ৪৭ হাজার ৯শ’ ৪ হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভর করে। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় এ বছর হাওরের ফসল রক্ষায় ৭৩টি প্রকল্পের বিপরীতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে খালিয়াজুরীতে ৪৫টি, মোহনগঞ্জে ১৩টি, মদনে ৯টি, পূর্বধলায় ৩টি, কলমাকান্দায় ২টি, বারহাট্টায় ১টি ও পাশ্ববর্তী ধর্মপাশায় ১টি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ২১ কোটি টাকা আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রথমে ৩ কোটি ১০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে দেওয়া হয় ১৬ কোটি ৮৮ লক্ষ টাকা।

মাঠজুড়ে পাকা ধান (ছবি- প্রতিনিধি)

এবছর কৃষি বিভাগ জেলায় চালের লক্ষ্যমাত্রা নিধারণ করা হয়েছে সাত লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন ও ধানের উৎপাদন লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন।

এ বছর কৃষকরা নানা শঙ্কা নিয়ে বোরো আবাদ করলেও ফলন ভালো হওয়া অনেকটা স্বস্তি ফিরেছে তাদের মনে। অনেকে আবার শ্রমিক সংকটের কারণে ক্ষেতের পাকা ধান কাটতে পারছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন তারা।

খালিয়াজুরী উপজেলার কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জমির ধান পেকে গেছে। এলাকায় শ্রমিক পাইনি। পরে পাবনা থেকে ২০ জন শ্রমিক এনে ধান কাটাছি।’

মদন উপজেলার কদমশ্রী গ্রামের কৃষক ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘ধান যেভাবে পেকেছে। শিগগিরই না কাটতে পারলে যেকোনও সময় সুর্যোগের মুখে পড়তে হবে। এদিকে, দুর্যোগ এড়াতে স্থানীয় কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছে জেলা কৃষি বিভাগ। কৃষি বিভাগের স্থানীয় মাঠ কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের কাছে গিয়ে এসব পরার্মশ দিচ্ছেন।’

খালিয়াজুরী উপজেলা চেয়ারম্যান সুয়েব সিদ্দিকী বলেন, শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা প্রশাসনের সহযোগিতায় আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবারাহের মাধ্যমে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা করার জন্য চেষ্টা করছি।

মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর গ্রামের কৃষক কাজল চৌধুরী বলেন, এবারে বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না। এক কাটা জমিতে ধান আবাদ করতে খরচ হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। ধান কাটাতে পারিশ্রমিক অনেক বেশি দিতে হচ্ছে। কিন্তু ধান বিক্রি করতে হচ্ছে অনেক কম মূল্যে। এতে আমাদের খরচ উঠলেও ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হবে।

খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, হাওরের বোরো ফসল অনেক ভালো হয়েছে। তবে ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এই সংকট নিরসন করার জন্য সরকারিভাবে ভর্তুকির মাধ্যমে ধানকাটার যন্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

নেত্রকোনা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বিলাশ চন্দ্র পাল জানান, হাওরের বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। অন্য যে কোনও বছরের তুলনায় ধান ভালো হয়েছে এবং কোনও দুর্যোগ না হলে কৃষকরা তাদের গত বছরের ফসলহানির ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, হাওরের ধান কাটার জন্য আধুনিক যন্ত্র রিপার ১৭৮টি, মিনি কম্বাইন হারস্টার ২৬টি বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া, মাড়াইয়ের জন্য পাওয়ার থ্রেসার ৩ হাজার ১৮৫ টি বিতরণ করা হয়েছে।

 

/এমএ/

লাইভ

টপ