কেসিসি নির্বাচন: দলীয় ঐক্যে জোর আ.লীগ-বিএনপির

Send
মো. হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
প্রকাশিত : ২২:১৪, এপ্রিল ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৯, এপ্রিল ১৮, ২০১৮

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনখুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে জিততে দলীয় ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই, মানছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলই। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে জেনেই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে তাই ঐক্য প্রতিষ্ঠাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে দল দুটি। দফায় দফায় বৈঠক করে ইতোমধ্যেই বিভেদ ঘুচিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা গেছে বলেও দাবি করছেন দল দুটির নেতারা।

জাতীয় নির্বাচনের বছরে আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। এ দুই সিটির ভোটের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনেও বিস্তৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে এ নির্বাচন বড় দুই দলের কাছেই গুরুত্ব পাচ্ছে। খুলনা বিএনপির নেতারা বলছেন, এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা দলের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিতে চান। বিএনপিকে বাদ দিয়ে জাতীয় নির্বাচন যে সম্ভব নয়, সেটিও জানান দিতে চান তারা।

আর আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে, তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের যে বিকল্প নেই, খুলনায় জিতে সেটিই প্রমাণ করতে চান তারা। জনগণ যে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আছে এখানে জিতলে তা-ই প্রতিষ্ঠিত হবে। বিএনপি চায় মেয়র পদ ধরে রেখে জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিতে। আর আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনে হারানো চেয়ারটি পুনরুদ্ধার করতে চায়।

প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে জয়ের লক্ষ্যে মরিয়া প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলই ঘর গোছানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে আক্রমণও করছে সমানতালে। মেয়র পদপ্রার্থী নিয়ে দুই দলের মধ্যে বিবৃতি-পাল্টা বিবৃতির ঝড় উঠেছে। সভা-সমাবেশে অভিযোগের তীর ছুড়ছেন তারা।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে হেভিওয়েট মেয়র পদপ্রার্থী থাকায় নির্বাচনি উত্তাপ এবার কিছুটা বেশি। দুই দলেই শুরুর দিকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে মহানগর ও জেলা কমিটির মতানৈক্য দেখা দিয়েছিল। তবে দ্রুতই এসব সামলে উঠেছে দুই দলই।

বিএনপি গত সোমবার যৌথসভার মাধ্যমে মতানৈক্যের অবসান ঘটিয়েছে। আর সাংগঠনিক ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করতে তৎপর রয়েছে আওয়ামী লীগ। বুধবার তাই জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের যৌথ আয়োজনে ৩ হাজার কর্মীর সভা আহ্বান করা হয়েছে। গল্লামারী স্মৃতিস্তম্ভের সামনে খোলা মাঠে এই সভা অনুষ্ঠিত হবে।  

নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় রাজনীতির বিষয়ে মহানগর বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপির নগর ও জেলা কমিটির যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ পথযাত্রার সূচনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দায়িত্ববোধ থেকেই বিএনপির সব শ্রেণির নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়েছেন। পাশাপাশি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এ ব্যাপারে দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার বার্তা নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির ঐক্য কার্যকর হয়েছে।’

জানা যায়, সোমবার খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির যৌথসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও নগর কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু নতুন করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ঘোষণা করেন। এতে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনাকে নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী, মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহারুজ্জামান মোর্ত্তজাকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। সভায় ১১টি উপ-কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে মহানগরীর সঙ্গে জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে খুলনায় মেয়র পদপ্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির মহানগর ও জেলা কমিটির মধ্যে দূরত্ব কমাতে দফায় দফায় বৈঠক করেন স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

বিএনপির জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, ‘বিএনপির জেলা সভাপতি শফিকুল আলম মনা এবার সিটি নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। এছাড়া দুটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হিসেবে আমরা দু’জনকে সমর্থন দিয়েছি। এসব নিয়ে নগর কমিটির সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব ছিল। তবে দলের এই দুঃসময়ে আমরা নিজেদের অবস্থান থেকে ছাড় দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘নজরুল ইসলাম মঞ্জু দলীয় গ্রুপিংয়ের ঊর্ধ্বের একজন মানুষ। এই নির্বাচনে আবারও জয়লাভ করে আমরা খুলনা থেকে ম্যাসেজ দিতে চাই- খালেদা জিয়া এবং ধানের শীষকে এ দেশের মানুষ ভালোবাসে। মিথ্যা ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় তাকে বন্দি রাখা যাবে না।’

গতকাল বিএনপি কার্যালয়ে ওই যৌথসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও খুলনা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ও ধানের শীষের ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নেই। অতীতের মতো এবারের নির্বাচনেও জেলা বিএনপি প্রচার, সভা-সমাবেশে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে।’

অন্যদিকে, গত সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের পরাজয়ে দলের একটি অংশের নিরব বিরোধিতা ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করে আওয়ামী লীগ। এবার তার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে বিষয়ে দলটি নেতারা সচেষ্ট রয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল বলেন, ‘খুলনায় মেয়র পদে পুনরায় বিজয় ছিনিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ মাঠে কাজ করছে। গল্লামারী বদ্ধভূমির সামনে আগামীকালের সভায় মহানগর ও জেলার নেতৃবৃন্দ, ৯টি উপজেলা ও ৬৮ ইউনিয়নের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত থাকবেন। এখানে নির্বাচনি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘দলের মেয়র পদপ্রার্থীকে নিয়ে কোনও বিভেদ নেই। সবাই একবাক্যে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আমরা সম্মিলিতভাবে আমাদের মেয়রপ্রার্থীকে বিজয়ী করতে চাই।’

আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশনা খুলনাবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে বঙ্গবন্ধুর দু’জন ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, শেখ সোহেল ও কেন্দ্রীয় নেতা এসএম কামাল হোসেন স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে সবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচন আগামী জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। দুই জেলার ৩৭টি আসনে এর প্রভাব পড়বে। এ জন্য এটি অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দলের ঐক্য ধরে রাখতে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে একাধিক সভা করছি। কেননা তাদের বোঝানো উচিত নৌকা শেখ হাসিনার মার্কা। তাই নৌকা মার্কার বিজয়ের মধ্য দিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশন আমাদের পুনরুদ্ধার করতে হবে।’

কেন্দ্রীয় নেতা এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ রয়েছে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা যে করবে, তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘সিটি নির্বাচনের মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে তালুকদার আব্দুল খালেক যোগ্য প্রার্থী। আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে প্রার্থী করেছেন। তাই আমরা আগে থেকেই ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। কেননা দলীয় নেতাকর্মীদের মতামত নিয়েই আমরা তাকে প্রার্থী করেছি।

মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক সরদার আনিছুর রহমান পপলু বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ নেতা তালুকদার আব্দুল খালেক। আনন্দের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে তার পক্ষে ভোট চাওয়া যায়। মেয়র থাকাকালে খুলনার মানুষকে যে উন্নয়ন তিনি উপহার দিয়েছেন, ইতোপূর্বে কোনও মেয়র তা দিতে পারেননি। জনগণ আজ বুঝতে পেরেছে তালুকদার আব্দুল খালেকের বিকল্প নেই। সেজন্য দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে নৌকার বিজয়ের পক্ষে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখতে চাই।’

/এএম/

লাইভ

টপ