ব্লগার অনন্ত হত্যার বিচার শুরুর আগেই আসামি জঙ্গি রাহীর মৃত্যু

Send
তুহিনুল হক তুহিন, সিলেট
প্রকাশিত : ০১:১৬, মে ১৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৩০, মে ১৮, ২০১৮

 

 ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যা মামলার বিচার শুরুর আগেই আসামি জঙ্গি মান্নান রাহী ওরফে মান্নান ইয়াহিয়া ওরফে এবি মান্নান ইয়াহিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ব্লগার অনন্ত হত্যার তিন বছর পর গত সোমবার (১৪ মে) সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে এই মামলার বিচারকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। সেদিনই জঙ্গি রাহীর মৃত্যুর বিষয়টি আলোচনায় আসে।  

এদিকে, গত সোমবার মামলার অন্যতম আসামি জঙ্গি নেতা শফিউর রহমান ফারাবীকে আদালতে হাজির না করায় ব্লগার অনন্ত হত্যার বিচারকাজ শুরু করেননি আদালত। পরবর্তীতে আদালত আগামী ৩০ জুন অভিযোগ গঠনের তারিখ নির্ধারণ করে এ মামলায় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরের আদেশ দেন। 

 এদিকে জঙ্গি রাহীর মৃত্যুর খবর জানেন না তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক (সাবেক) আরমান আলী। যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বর্তমানে তিনি সিআইডি পুলিশ থেকে ডিবি পুলিশে কর্মরত। তিনি সিআইডি পুলিশে থাকাকালীন ব্লগার অনন্ত হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা থাকায়  অভিযোগপত্রে রাহীর নাম উল্লেখ করেন। মামলা চলাকালীন রাহীকে একাধিকবার সিলেটে নিয়ে আসা হয়।

রাহী মারা গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। অনেক আগে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছিলাম।’

 এ ব্যাপারে সিলেট জেলা ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি মফুর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুনেছি গত বছরের নভেম্বরের দিকে ব্লগার অনন্ত হত্যা মামলার আসামি জঙ্গি নেতা মান্নান রাহী কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ হলে তাকে পিজি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।’

রাহীকে অনন্ত হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করে সিআইডি পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষ মারা গেলে সাধারণত তার এমনিতেই অব্যাহতি হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে আদালতও অবগত আছেন। ’

সিলেটের কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আহাদ বলেন, ‘গত অক্টোবরের শেষের দিকে কাশিমপুরে জঙ্গি রাহী অসুস্থ হয়ে পড়লে থাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ২ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়।  সব প্রস্তুতি সম্পন্ন শেষে তার লাশ কানাইঘাটে নিয়ে আসে পরিবার। সম্ভবত ৩ নভেম্বর কানাইঘাটের পূর্ব ফালজুর গ্রামে জানাজা শেষে তার লাশ পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।’  

সূত্র জানায়, মান্নান রাহী সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার পূর্ব ফালজুর গ্রামের হাফিজ মঈন উদ্দিনে ছেলে। সে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় সে পড়ালেখা শেষ করতে পারেনি।

সূত্র আরও জানায়, ব্লগার অনন্ত হত্যার সঙ্গে রাহীর সংশ্লিষ্টতায় থাকায় সিআইডি পুলিশের একটি দল ২০১৫ সালের ২৮ আগস্ট কানাইঘাট থেকে রাহী ও তার ভাই মোহাইমিন নোমান ওরফে এএএম নোমানকে গ্রেফতার করে। এরপর হত্যার দায় স্বীকার করে ওই বছর সিলেট মহানগর হাকিমের তৃতীয় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় রাহী। এসময় রাহী আদালতকে জানায়, অনন্ত হত্যায় সেসহ ৫ জন অংশ নেয়। এরমধ্যে দুজন অনন্তকে কোপায় আরও বাকি তিনজন ছিল প্রোটেকশনের দায়িত্বে। ইসলামবিরোধী লেখালেখির জন্য অনন্তকে হত্যা করা হয় বলে সেসময় আদালতকে জানায় রাহী। 

জানা যায়, ২০১৫ সালের ১২ মে সকালে নগরের সুবিদবাজারের নূরানী আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আলোচিত এ মামলাটির তিন বছর পূর্ণ হয়েছে গত শনিবার (১২ মে)।  হত্যাকাণ্ডের পর দিন সিলেট মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় নিহত অনন্ত বিজয়ের বড় ভাই রত্মেশ্বর দাশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা চারজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।  মামলাটি প্রথম দফায় থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরবর্তীতে ওই বছরের ১৫ মে মামলার তদন্তের জন্য সিলেট মহানগর পুলিশ থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ২৭ মে মামলাটি সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমে তদন্তের জন্য দেওয়া হয়।

আদালত সূত্র জানায়, আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে কানাইঘাট উপজেলার ফালজুর গ্রামের আবুল হোসেন ওরফে আবুল হোসাইন (২৫) ও একই উপজেলার খালপাড় তালবাড়ীর ফয়সাল আহমেদ (২৭), তাহিরপুর উপজেলার বিরেন্দ্রনগরের (বাগলী) হারুন অর রশিদ (২৫) কানাইঘাটের ফালজুর গ্রামের মান্নান ইয়াহইয়া ওরফে মান্নান রাহী ওরফে এবি মান্নান ইয়াহিয়া ওরফে ইবনে মইন (২৪) ও একই গ্রামের আবুল খায়ের রশিদ আহম্মেদকে (২৪) আসামি করা হয়। এছাড়াও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রে ওই ৫ আসামিসহ জঙ্গি নেতা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কালীশ্রীপাড়ার সফিউর রহমান ফারাবী ওরফে ফারাবী সফিউর রহমানকে (৩০) আসামি করা হয়।

পৃথক অভিযোগপত্রের ৬ আসামির মধ্যে মান্নান রাহী ও আবুল খায়ের রশিদ আহম্মেদকে গ্রেফতার করে সিআইডি। পরে ফারাবীকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এরমধ্যে আসামি আবুল  হোসেন, ফয়সাল আহমেদ ও হারুন রশিদ এখনও পলাতক রয়েছে। এদিকে পৃথক অভিযোগপত্রে ঘটনার পর গ্রেফতার হওয়া ফটো সাংবাদিক ইদ্রিস আলীসহ ১০ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আরমান আলী তদন্ত শেষে পৃথক অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন। ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট ৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় সিআইডি। আদালত মামলার পর্যবেক্ষণের পর ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি ৬ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এই অভিযোগপত্রের ৫ আসামি প্রথম দফায় দেওয়া অভিযোগপত্রের আসামি।

 

/এআর/

লাইভ

টপ