বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে শ্রমিকদের লাগাতার আন্দোলন, সমাধান কী?

Send
বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
প্রকাশিত : ১১:১৫, মে ১৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:১২, মে ১৯, ২০১৮

দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতি অব্যাহত রয়েছে। গত রবিবার (১৩ মে) থেকে তারা খনির গেটে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। ১৩ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আন্দোলনকারীদের কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। তবে কর্তৃপক্ষের এই আবেদন সাড়া দেননি শ্রমিক-কর্মচারীরা। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও সমস্যা সমাধানে এখনও কোনও আশার বাণী শোনা যায়নি। এ কারণে কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে তা নিয়ে শঙ্কাই থেকে যাচ্ছে।


আউটসোর্সিং শ্রমিকদের স্থায়ী নিয়োগ, বকেয়া বেতন-ভাতা প্রদান, প্রফিট বোনাসসহ ১৩ দফা দাবিতে গত রবিবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শ্রমিকরা। কর্মবিরতির তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার (১৫ মে) শ্রমিকদের সঙ্গে খনি কর্মকর্তাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও পরবর্তীতে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। আন্দোলনরত শ্রমিকরা খনির গেটে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে। আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে ২০টি গ্রামের লোক এতে যোগ দিয়েছেন। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা।
কয়লা খনির শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের দাবি যৌক্তিক। কিন্তু এই যৌক্তিক দাবির প্রতি কর্তৃপক্ষ কোনও কর্ণপাত করছেন না। যতদিন দাবি বাস্তবায়ন না হবে ততদিন আন্দোলন চলবে।
শ্রমিক অমিত হোসেন জানান, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া দীর্ঘদিনের। কিন্তু বারবার সময় ক্ষেপণ করছেন কর্তৃপক্ষ। যার ফলে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন শ্রমিকরা।
এদিকে লাগাতার কর্মবিরতির পাশাপাশি খনির গেটে অবস্থান কর্মসূচি পালন করায় খনিতে কর্মরত দেশি-বিদেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারসহ প্রায় ৩০০ মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি করেছেন খনি কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার কথা অস্বীকার করেছে শ্রমিক নেতারা।
শ্রমিকদের লাগাতার কর্মবিরতির পঞ্চম দিন বৃহস্পতিবার (১৭ মে) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দীন আহাম্মদ বলেন, ‘খনির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়াম কর্তৃক নিয়োজিত শ্রমিকরা গত ১৩ মে থেকে কর্মবিরতির পাশাপাশি খনির বিভিন্ন গেটে অবস্থান নিয়েছে। ফলে খনিতে কর্মরত দেশি-বিদেশি কমকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারসহ প্রায় ৩০০ নাগরিক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। অবরোধকারীরা খনি এলাকার ভেতরে কোনও ধরনের খাদ্য, ওষুধ দিচ্ছেন না। কেউ বাইরে যেতে চাইলেই শ্রমিকরা হামলা চালায়।’ কর্মবিরতির তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার খনির কর্মকর্তাদের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শ্রমিক ও বহিরাগতদের এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দীন আহাম্মদ আরও বলেন, ‘পুরাতন চুক্তির তুলনায় চলমান চুক্তিতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ সুবিধাদি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরপরও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান শ্রমিকদের সঙ্গে বসে বেতন-ভাতার বিষয়ে আলোচনা করতে চেয়েছেন। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানে বিদেশে থাকায় সেই আলোচনার সুযোগ না দিয়েই শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন।’
তিনি শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার সুষ্ঠু সমাধান করা হবে। ’
সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড এক্সপ্লোরেশন) এবিএম কামরুজ্জামান, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবুল কাসেম প্রধানিয়া, মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) এটিএম নুরজ্জামান চৌধুরী, উপ-মহাব্যবস্থাপক খান মোহাম্মদ জাফর সাদিকসহ খনির অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
খনি কর্মকর্তাদের এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বড়পুকুরিয়া শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ১৩ দফা দাবি আদায়ে কর্মবিরতি পালন করছি। কিন্তু খনির কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবরুদ্ধ করিনি। গত মঙ্গলবার শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে খনির কর্মকর্তারাই আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ’
তিনি আরও বলেন, ‘১৩ দফা দাবির পাশাপাশি আমাদের ওপর হামলাকারীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন কর্মসূচি থেকে ফিরে আসবো না।’
এদিকে কর্মবিরতির তৃতীয় দিনে গত মঙ্গলবার খনি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগে পার্বতীপুর থানায় দুটি মামলা দায়ের করেছেন খনি কর্তৃপক্ষ। খনির ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) সৈয়দ ইমাম হোসেন কর্তৃক দায়েরকৃত এই মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩০/৩৫ জনকে। পার্বতীপুর থানার ওসি হাবিবুল হক প্রধান এই মামলা দায়েরের কথা নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য, অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী আউটসোর্সিং শ্রমিকদের স্থায়ী নিয়োগ প্রদান, নতুন টেন্ডারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু, বিভিন্ন ছুটির প্রাপ্য মজুরি প্রদান, প্রফিট বোনাসসহ ১৩ দফা দাবিতে গত রবিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শ্রমিক-কর্মচারীরা। খনির ১ হাজার ৪১ জন শ্রমিক অনির্দিষ্টকালের এই কর্মবিরতি শুরু করায় রবিবার সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে খনির কয়লা উত্তোলন কার্যক্রম। পাশাপাশি শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ৬ দফা দাবি আদায়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে খনিতে কয়লা উত্তোলনের কারণে ২০ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সমন্বয় কমিটির নেতারা।

/এআর/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ