গতবছর কয়েক দফা বন্যায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় দিনাজপুরের গ্রামীণ অঞ্চলের রাস্তাঘাট। এক বছর পরও শুকায়নি সে ক্ষত। এখনও অনেকস্থানে সড়কের বেহাল দশা। রাস্তাঘাট মেরামতে কোটি কোটি টাকার কাজ হলেও দায়সারাভাবে সেগুলো করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তারা জানান, মাটির বদলে বালু দিয়ে কাজ করায় বর্ষার শুরুতেই রাস্তা ধসে ও দেবে যেতে শুরু করেছে। এখন সেই জরাজীর্ণ রাস্তা দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে জনসাধারণকে। তবে জোড়াতালি দিয়ে রাস্তার কাজ ও সেখানে অনিয়মের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন দিনাজপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের কর্মকর্তা।
গত বছরের ভয়াবহ বন্যায় দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়। বন্যার পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে যায় গ্রামীণ জনপদের রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট। দিনাজপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ১৩টি উপজেলার মোট রাস্তাঘাটের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে আড়াই হাজার কিলোমিটার পাকা। আর ব্রিজ ও কালভার্ট রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩ শ’ টি। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে বড় ধরনের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২০৪ কিলোমিটার পাকা সড়ক ও ৯২টি বিজ-কালভার্ট। ইতোমধ্যেই মেনটেইনেন্স খাত থেকে ৫০ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে এসব সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট মেরামতে। বর্তমানে রুলার কানেক্টিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আরসিআইপি) থেকে ৪১ কোটি টাকার কাজ চলমান রাখা হয়েছে। মোট ৯১ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। তবে পাল্টায়নি গ্রামীণ রাস্তাঘাটের ভাঙাচোরা চিত্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, দিনাজপুর সদর উপজেলার জামতলী-নশিপুর সড়কের খালপাড়া এলাকায় কালভার্টের সংযোগস্থলের উভয়পাশের মাটি বন্যার পানির প্রবল স্রোতে ভেসে যায়। দীর্ঘদিন এই এলাকার মানুষ ওই রাস্তা দিয়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাচল করে। পরবর্তীতে বালু মাটি দিয়ে কোনোরকমে মেরামত করা হলেও গত কয়েকদিন আগে আবারও তা ভেঙে যায়। বর্তমানে কষ্ট করেই চলাচল করতে হচ্ছে ওই এলাকার মানুষজনকে।
এলাকার সুদেব চন্দ্র রায় জানান, ‘গত বছরে ভেঙে গেলেও এখনও রাস্তাটি ঠিক করা হয়নি। বালু দিয়ে কোনোরকমে চলাচলের উপযোগী করা হলেও এখন ভ্যানের চাকা বালুতে দেবে যাওয়াসহ বিভিন্ন ছোটখাটে দুর্ঘটনায় পড়তে হচ্ছে। বিষয়টি বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। কয়েক মাস আগে মাপঝোক নিয়ে গেছে। কিন্তু কাজ শুরু হয়নি এখনও। আর কতদিন কষ্ট করে এভাবে চলাচল করতে হবে?’
এলাকার আয়েশা খাতুন বলেন, ‘রাস্তার ভেঙে যাওয়া এলাকার লোকজনের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। বালু দিয়ে ভরাট করে ও জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকমে চলাচলের উপযোগী করা হলেও সমস্যা সমাধান না হয়ে বরং দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ইজিবাইকসহ মিনিপিকআপ চলাচল করতে পারছে না, কোনোরকমে ভ্যান-রিকশা চলাচল করতে পারলেও ঘটছে দুর্ঘটনা। কিছুদিন আগেও এখান থেকে ভ্যানসহ চালক পড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন।’
শুধু ওই রাস্তাটিই নয়, গত বছরের বন্যায় বাশেরহাট থেকে কর্ণাই যাওয়ার রাস্তাটির একটি স্থানে ভেঙে যায়। ওই রাস্তার একটি কালভার্টও পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে যায়। কিছুদিন আগে জোড়াতালি দিয়ে রাস্তাটি কোনও রকমে মেরামত করে পিস দিয়ে কার্পেটিং করা হয়েছে। কিন্তু বর্ষার পানিতে ওই রাস্তাটিও ধসে যেতে শুরু করেছে। রাস্তাটির দুইপাশে রড-সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে সাপোর্ট দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বর্ষার পানির চাপে রাস্তাটি আবারও ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন এলাকাবাসী।
এলাকার শমসের উদ্দিন জানান, ‘এই রাস্তাটি শুধু বালু দিয়েই মেরামত করা হয়েছে। বর্ষায় পানির প্রবল স্রোত থাকে। এতে করে এটি টিকবে না, বিষয়টি ঠিকাদারকে জানানো হলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। যদি রাস্তাটি আবারও ভেঙে যায় তাহলে আবারও কষ্টের মধ্যে পড়তে হবে এলাকাবাসীকে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘চালাকি করে রাস্তাটি শুধু বালু দিয়েই মেরামত করা হয়েছে। এলাকাবাসীর আপত্তিকে কোনও রকম তোয়াক্কা না করেই কাজটি করা হয়েছে। রাস্তায় যেভাবে চলাচল করা হয় তাতে করে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই রাস্তাটি ভেঙে যাবে। রড-সিমেন্টের শক্ত সাপোর্ট করার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। রাস্তা নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে।’
শুধু রাস্তাঘাটই নয়, যেসব ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেসবও মেরামত করা হয়নি সঠিকভাবে। বেশিরভাগ ব্রিজই মেরামত করা হয়নি। তাই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কষ্ট করেই চলাচল করতে হচ্ছে জনসাধারণকে। বাশেরহাট থেকে কর্ণাই যাওয়ার রাস্তাটির যে কালভার্ট বন্যায় ভেঙে যায়, এক বছরেরও বেশি সময় পরও সেটি মেরামত করা হয়নি। এখন লোকজনকে চলাচল করতে হয় ব্রিজের পাশের জমির ওপর দিয়ে নির্মাণ করা অস্থায়ী রাস্তা দিয়ে। ফলে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর যাতায়াতে মহাসমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
এলাকার কৃষক দেবেন্দ্র নাথ রায় জানান, ‘ধানসহ শাক-সবজি ভ্যানে করে বাজারে নিয়ে যেতে হয়। অথচ এই কালভার্ট ভেঙে যাওয়ায় উৎপাদিত পণ্য নিয়ে যেতে পারছেন না তারা। অস্থায়ী রাস্তাটি চিকন হওয়ায় ঠিকভাবে ভ্যান চলাচল করতে পারছে না।’
কর্ণাই আদর্শ দাখিল মাদ্রাসার সহ-সুপার মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এক বছর ধরে ব্রিজটি ভাঙা। শিক্ষার্থীরা যাওয়া-আসা করতে পারছে না। বর্ষায় পানি জমলে শিক্ষার্থীরা আসতে পারে না, দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের। ফলে পড়ালেখার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। শিগগিরই ব্রিজটি মেরামত করে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানাই।’ ক্ষতিগ্রস্ত অন্য রাস্তার কাজও ঠিকমতো করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দিনাজপুর সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রায়হান শরিফ বলেন, ‘এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও জনবহুল এই এলাকার রাস্তাটি মেরামত করা হয়েছে দায়সারাভাবে। ব্রিজ ভেঙে গেলেও ঠিক করা হচ্ছে না। বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্নভাবে ঘুরেও কোনও কাজ হয়নি। এলাকার কৃষকসহ শিক্ষার্থীদের চলাচলে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। হাজার হাজার লোকজন প্রতিদিন চলাচল করছেন ভোগান্তি সহ্য করেই। তাই দ্রুত রাস্তাঘাটসহ ব্রিজ-কালভার্ট মেরামতের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই।’
দৃশ্যমান এত অনিয়মের পরও ‘কোনও অভিযোগ নেই’ বলে জানিয়েছেন দিনাজপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যেই প্রথম ধাপে ৫০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৪১ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে যা শেষের পথে। কোনও কাজের ত্রুটি নেই। নির্দিষ্ট করে বলতে হবে কোন কাজটি ঠিকভাবে হয়নি। এখনও এলাকার লোকজন কোনও অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে সঙ্গে সঙ্গেই কাজটি ঠিক করে দেওয়া হবে। আমি এমন কাজ করি না, অপ্রত্যাশিত কাজ আমি করি না।’
আরও পড়ুন- সওজের তিন কিলোমিটার সড়কে জনদুর্ভোগ







