কাজ না করেই টিআর, কাবিখার লাখ লাখ টাকা লোপাট!

Send
নাজমুল হুদা নাসিম, বগুড়া
প্রকাশিত : ১৯:০৬, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৪, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৮

কাজ না করে টাকা লোপাটের অভিযোগবগুড়ার ধুনট উপজেলায় ভুয়া প্রকল্প এবং বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের নামে টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) ও কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্পের কাজ না করেই লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) যোগসাজশে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির লোকজন ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে সরকারের লাখ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। স্থানীয়রা এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জনিয়েছেন।

অনিয়মের বিষয়টা অস্বীকার করেছেন পিআইও (চলতি দায়িত্ব) আব্দুল আলীম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘ভুয়া প্রকল্পের অনুকূলে অর্থ ছাড় করাসহ টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’

ধুনট উপজেলা পিআইও অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সাধারণ ও বিশেষ কোটায় দুই কিস্তিতে কাবিখা প্রকল্পের সাড়ে ৫২ লাখ টাকার ১২৫.৪৭৩ মেট্রিক টন চাল, কাবিটা প্রকল্পের অনুকূলে এক কোটি ৫০ লাখ ৫৬ হাজার ১৩৫ টাকা এবং টিআর প্রকল্পের অনুকূলে দুই কোটি ২৯ লাখ ১১ হাজার ৪৭০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শতভাগ শেষ করার সরকারি নির্দেশ ছিল। অধিকাংশ প্রকল্পে কাজ করা হয়নি। তবে কাগজ কলমে শতভাগ কাজ দেখিয়ে ভুয়া মাস্টাররোলের মাধ্যমে এসব প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ অর্থ উত্তোলন করে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিলকাজুলী পোস্ট অফিস না থাকলেও এর আসবাবপত্র ক্রয় দেখিয়ে টিআর প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ধুনট উপজেলা পোস্টমাস্টার বাবুল আকতার জানান, বিলুকাজুলী পোস্ট অফিস নামে এ উপজেলায় কোনও পোস্ট অফিস নেই। কোনাগাঁতি হাফেজিয়া মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ টিআর প্রকল্পের এক লাখ ৭০ হাজার টাকা উত্তোলন করে মাত্র ৩০ হাজার টাকা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ইসমাইল হোসেন জানান, তার প্রতিষ্ঠানের নামে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছিল তা তিনি জানেন না। পিআইও অফিস থেকে তাকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া না হলেও গোশাইবাড়ি দ্য মর্নিং সান উচ্চবিদ্যালয়ের উন্নয়নে ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ বরাদ্দের সব টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে।

মানিক পোটল পাকা রাস্তার মসজিদ থেকে চিথুলিয়া ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের নামে কাবিটা প্রকল্পের ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রকল্প সভাপতি গোশাইবাড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হাই বলেন, ‘রাস্তা সংস্কারের জন্য কত টাকা বরাদ্দ এবং কত টাকার কাজ হয়েছে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমার এলাকার সালাম নামে এক ব্যক্তি মাস্টাররোলে স্বাক্ষর নিয়েছেন।’

ধুনট সদর ইউনিয়নের উল্লাপাড়া আজিজুলের দোকান থেকে হলহলিয়া নদী পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৪৯৯ টাকা। একই রাস্তার উল্লাপাড়া বাবুলের দোকান থেকে আজিমুদ্দিনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার দেখিয়ে কাবিখা প্রকল্পের সাড়ে ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকার আজিজুল হক, রেজাউল করিম ও রূপালী খাতুন জানান, এ রাস্তায় কোনও মাটিকাটা হয়নি। রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

রাস্তা না করেই প্রকল্পের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছেএকই রাস্তার দুই প্রকল্প কমিটির সভাপতি ধুনট সদর ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য ফুলেরা খাতুন বলেন, প্রকল্প দুটিতে কত টাকা বরাদ্দ এবং মাটি কাটা হয়েছে কিনা তা তিনি জানেন না। পিআইও অফিসের লোকজন শুধু তার কাছে কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছেন।

বিলকাজুলী দুলাল শীলের বাড়ি থেকে পরশের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার উন্নয়ন দেখিয়ে ৭৪ হাজার ৬০১ টাকা ও চালাপাড়া আলীম ডাক্তারের ওষুধের দোকান থেকে বুজুর আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের নামে আরও ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সোনামুখী পাকা রাস্তার চৌকিবাড়ী হতে আমিনের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের নামে কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ দেওয়া ৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে কোনও কাজ না করেই। একই এলাকার চৌকিবাড়ী জসিম মণ্ডলের বাড়ি হতে রফিক মেম্বারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য কাবিখা প্রকল্পের সাড়ে ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ নিয়ে কোনও কাজ করা হয়নি।

ওই দুটি প্রকল্পের সভাপতি চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প দুটিতে ৬০/৭০ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। অবশিষ্ট টাকা কোথায় গেছে এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

এছাড়া বিলকাজুলী নোটাগাড়ি কালভার্ট থেকে চন্দ্রনাথ সরকারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৮ মেট্রিক টন চাল উত্তোলন করা হয়েছে। অথচ এখানে কোনও কাজ করা হয়নি। ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী মাঠপাড়া স্কুলের শিক্ষার্থীরা জানায়, রাস্তায় মাটির কাজ না করায় প্রতিদিন কাপড় ভিজে যায়। এভাবেই স্কুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ওই শিক্ষার্থী ছাড়া ভুক্তভোগী মানুষ তদন্তসাপেক্ষে সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

/এসটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ