নরসিংদীর পাঁচ আসনেই আ.লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক, বিরোধ চরমে

Send
আসাদুজ্জামান রিপন, নরসিংদী
প্রকাশিত : ২২:৩১, অক্টোবর ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৪০, অক্টোবর ১২, ২০১৮

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতাকে কেন্দ্র করে নরসিংদী জেলার পাঁচটি আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। যিনি যেমন পারেন লবিং করছেন, করছেন গ্রুপিং। সম্ভাব্য এসব প্রার্থীর এ কোন্দল ছড়িয়ে পড়েছে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও।

বিএনপিসহ অন্যান্য দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা খুব বেশি লক্ষণীয় না হলেও ক্ষমতাসীনদের নেতাকর্মীদের মধ্যে বেড়েই চলছে বিভেদ। এর জেরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাঁটানো পোস্টার, বিলবোর্ড ছিঁড়ে-খুলে ফেলার দেওয়ার পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটছে। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে জনসভা করেও বিরোধিতা জানান দেওয়া হচ্ছে।

এর মধ্যে নরসিংদী-৪ (বেলাব-মনোহরদী) আসনে নানা অনিয়মের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য সব প্রার্থী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নেমেছেন বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনেও চলছে পাল্টাপাল্টি গ্রুপিং, লবিং। নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে মহাজোটের (জাসদ) সম্ভাব্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগ। নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে চলছে কোন্দল। একই অবস্থা বিরাজ করছে নরসিংদী-১ (সদর) আসনেও।

বেলাব পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক অনুষ্ঠানে নরসিংদী-৪ (বেলাব ও মনোহরদী) আসনে আ.লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরাসরেজমিনে জেলার পাঁচ আসনের নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে এবং নেতাকর্মী ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

নরসিংদী-১ (সদর)

নরসিংদী-১ (সদর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে তিনি ছাড়াও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে ইচ্ছুক একাধিক নেতা। এর মধ্যে মাঠে রয়েছেন ফ্লোরিডা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আইয়ুব খান মন্টু। তিনি গণসংযোগের পাশাপাশি নির্বাচনি এলাকায় পোস্টার ও বিলবোর্ড টাঙিয়েছেন। তবে সেসব ছিঁড়ে-খুলে ফেলাসহ তার ছবিতে কালিলেপন করার ঘটনা ঘটছে। দলীয় কর্মসূচিতে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে তার কর্মী-সমর্থকদের।

সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি জি এম তালেব হোসেন। তিনিও পোস্টার-বিলবোর্ড লাগিয়েছেন। চাইছেন দলীয় মনোনয়ন। নিজেকে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও চলছে পক্ষে-বিপক্ষে লবিং, গ্রপিং। বিএনপিতেও একাধিক প্রার্থী থাকলেও দলীয় গ্রুপিং চলছে অনেকটা নেপথ্যে।

ফ্লোরিডা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আইয়ুব খান মন্টু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাঠে নামার পর থেকে আমার পোস্টার, বিলবোর্ড ছিঁড়ে ফেলা, কালিলেপন করাসহ নোংরামি করা হচ্ছে। কে বা কারা এসব করছে সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে এসব নোংরামি করা হচ্ছে বলে মনে করছি। এতে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হচ্ছে।’

জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি জি এম তালেব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ছাত্রজীবন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দলের জন্য কাজ করে আসছি। নেতা-কর্মীদের ইচ্ছায় নিজে প্রার্থী হতে চাইছি বলে আমি নাকি হঠাৎ করে রাজনীতি করি— এমন মিথ্যা অভিযোগসহ আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার শুরু হয়েছে। তবে আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি।’

নরসিংদী-২ (পলাশ)

নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনে মাঠ গোছাতে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও মহাজোটের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আসনটিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান দলের একক প্রার্থী হলেও প্রার্থিতা নিয়ে টানাপোড়েন চলছে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের শরিক জাসদের মধ্যে।

২০১৪ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক এমপি ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খানকে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে এ আসন থেকে মহাজোটে শরিক জাসদের (ইনু) জায়েদুল কবীরকে প্রার্থী করা হয়। সে সময় জায়েদুলকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগ ঘরানার (ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খানের ছোট ভাই) স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আশরাফ খান জয়ী হন। তাই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিয়ে অনেকটা প্রকাশ্যেই বিরোধ চলছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে।

মহাজোট থেকে আবারও প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে জায়েদুল গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনি এলাকায় তিনি সাঁটিয়েছেন পোস্টার, টাঙানো হয়েছে বিলবোর্ড। নেতা-কর্মীদের নিয়ে মাঠে আওয়ামী লীগ দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থী ও এর অঙ্গসংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের দ্বারা একাধিকবার হামলার শিকার ও বাধা পেয়েছেন জায়েদুল। তার পোস্টার-বিলবোর্ড নামিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে।

জেলা জাসদের সভাপতি জায়েদুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমদিকে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা একটু বেশি ঘটেছে, এখন খুব একটা ঘটছে না। তবে এসব ঘটনায় সুনির্দিষ্টভাবে কারও বিরুদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই।’

এ ব্যাপারে পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক এমপি ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ বলেন, ‘এখানে জাসদের কোনও জনভিত্তি নাই। আওয়ামী লীগের উন্নয়নের সুফল ও দলীয় প্রতীক নৌকাকে ব্যবহার করতেই জাসদ এখানে প্রার্থী হতে চাইছে। তবে তাদের কেউ বাধা প্রদান করছে বা পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে— এমনটা আমার জানা নেই।’

নরসিংদী-৩ (শিবপুর)

আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য (স্বতন্ত্র) যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নৌকাকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে তার। তিনি আওয়ামী লীগের কেউ নন— এমন দাবি করে একাট্টা হয়ে মাঠে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন অর রশিদ খান, সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম রাখিল ও সাবেক এমপি জেলা আওয়ামী লীগ নেতা জহিরুল হক মোহন। তাদের দাবি, একটি মহল আওয়ামী লীগকে দ্বিখণ্ডিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।

আর সিরাজুল ইসলাম মোল্লার দাবি, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রায় সব নেতাকর্মী তার সঙ্গে রয়েছেন।

এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ। দু’ভাগে বিভক্ত নেতাকর্মীরা পক্ষে-বিপক্ষে মিটিং-মিছিল, সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ অব্যাহত রাখায় নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বিরোধ বাড়ছে দলটিতে। পাল্টাপাল্টি সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার-বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে নির্বাচনি এলাকা। প্রায়ই এসব ছিঁড়ে-খুলে ফেলার ঘটনা ঘটলেও অবশ্য পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নেই কারও।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম রাখিল বলেন, ‘অতীতের যেকোনও সময়ের তুলনায় এখনকার আওয়ামী লীগ অনেক শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ। দলে কোনও বিরোধ বা কোন্দল নেই। বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের কেউ নন। সুতরাং দলীয় কোন্দলের প্রশ্নই আসে না।’

সাংসদ সিরাজুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেহেতু একটা বৃহৎ দল, সেহেতু দলে একাধিক প্রার্থী থাকতেই পারেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক নিজেরাই এখানে প্রার্থী হতে চান। তাই উনারা ছাড়া দলীয় প্রায় সব নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছেন। দলে কোনও গ্রুপিং বা দ্বন্দ্ব নেই।’

তবে তিনি বলেন, ‘প্রার্থী হওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা সাময়িক থাকবেই। প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে আমরা সবাই একমঞ্চেই থাকবো। যেহেতু সবাই দলের সিদ্ধান্তের উপর আস্থাশীল।’

নরসিংদী-৪ (বেলাব-মনোহরদী)

এ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে চরমে পৌঁছেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের লবিং-গ্রুপিং। আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন চূড়ান্তের দাবিতে একাট্টা হয়েছেন দলটির পাঁচজন মনোনয়নপ্রত্যাশী।

তারা হলেন- বাংলাদেশ ভলিবল ফেডারেশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি, জেলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক উপদেষ্টা ও শিল্পপতি (সিআইপি) এ এইচ আসলাম সানী, মনোহরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য লে. কর্নেল (অব.) আব্দুর রউফ বীরবিক্রম, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিব) সহ-সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. এম এ রউফ সরদার, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মনোহরদী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খান বীরু ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের উপ-শিক্ষা সম্পাদক কাজী মো. মাজহারুল ইসলাম।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর বেলাব পাইলট মডার্ন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন, কমিটি বাণিজ্য, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করা, এলাকার সার্বিক উন্নয়নে ভূমিকা না রাখা, জনবিচ্ছিন্নতাসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে পুনরায় তাকে মনোনয়ন না দিয়ে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

বেলাব উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সমসের জামান ভূঁইয়া রিটনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ জনসভায় বেলাব ও মনোহরদী উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ২০ সহস্রাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমান এমপিকে উদ্দেশ্য করে তারা বলেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দলে বিভক্তি সৃষ্টি করে টাকার বিনিময়ে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে কমিটি বাণিজ্য আর বেলাব-মনোহরদীবাসী মেনে নেবে না। টিআর, কাবিখার নামে লুটপাট, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে দলীয় ভাবমূর্তি নষ্ট করার অধিকার আপনার নাই। এই দল আপনার পরিবারের নয়, জননেত্রী শেখ হাসিনার দল, জনগণের দল।

নানা অভিযোগে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনকে এড়িয়ে এই পাঁচ নেতা পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি, গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করছেন। এই পাঁচজন মনোনয়ন পরিবর্তনে ঐক্যের ডাক দিয়ে একাট্টা হয়েছেন।

এ বিরোধিতার বিষয়ে অ্যাডভোকেট নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বৃহৎ দল হিসেবে ভেদাভেদ তৈরি হতেই পারে। যারা বিরোধিতা করছেন তারা সবাই দলেরই লোক। মনোনয়ন নিয়ে তৈরি এ বিরোধ সাময়িক। প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার পর সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েই কাজ করবেন, কোনও কোন্দল থাকবে না। কেননা সবাই নৌকার বিজয় দেখতে চাই।’

বেলাব পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরানরসিংদী-৫ (রায়পুরা)

এ আসনের বতর্মান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু। বার্ধক্যজনিত কারণে কিছুটা অসুস্থ হলেও নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় রয়েছেন তিনি। পাঁচ বারের সংসদ সদস্য থাকায় তিনি অবহেলিত চরাঞ্চলসহ রায়পুরা এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এখানে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপিতে প্রকাশ্য কোন্দল না থাকলেও রয়েছে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর পৃথক পৃথক কর্মীবাহিনী ও অনুসারী। বিএনপির তুলনায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে রয়েছে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। আর এ মনোনয়নকে ঘিরে গ্রুপিং-লবিংয়ে জড়িয়ে পড়েছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা। আর এ বিরোধ ছড়িয়ে পড়েছে ২৪টি ইউনিয়নের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যেও।

এই নির্বাচনি এলাকার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে দিনের পর দিন ছড়িয়ে পড়া ক্ষমতাসীন দলের কোন্দল চরমে পৌঁছেছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সৃষ্ট  কোন্দলে চরাঞ্চলে রক্তপাতও হয়েছে। আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, দলীয় কোন্দল আর ক্ষমতার লড়াইয়ে রায়পুরা আওয়ামী লীগের শত্রু এখন যেন আওয়ামী লীগই!

বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে পৌরসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়া, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করা, টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন দেওয়া, দলীয় ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনে অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা কারণে কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগ। দলীয় নেতাদের মধ্যে এসব বিভক্তির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে নিলক্ষা, বাশঁগাড়ীসহ চরাঞ্চলের একাধিক ইউনিয়নে দফায় দফায় ঘটেছে সংঘর্ষ। ঘটেছে বেশ কয়েকটি হত্যার ঘটনাও। দায়ের হয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে একাধিক মামলাও। প্রতিনিয়তই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে বাঁশগাড়ী, নিলক্ষ্যা, চাঁনপুর, মরজাল, পাড়াতলী, মির্জাপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন হলেও মাঠ পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলটির এসব মারামারি, খুনোখুনি, সহিংসতা ও সংঘর্ষ বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নরসিংদী-৫ আসনে মাঠে নেমেছেন একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী। এর মধ্যে আলোচনায় আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু, তার ছোট ভাই জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার, ব্যারিস্টার তৌফিকুর রহমান, রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফজাল হোসাইন এবং কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা অ্যাডভোকেট সামসুল হক।

তাদের মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য রাজি উদ্দিন আহম্মেদ রাজু ও অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনুসারীরা তাদের নিজেদের প্রার্থীকে এই আসনের দলীয় প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাইছেন। এ নিয়ে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে দলটি।

অনেকে আবার ‘সংসদ সদস্য রাজু ঠেকাও’ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন। তাদের অভিযোগ, রাজুর কারণেই আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রায়পুরা আওয়ামী লীগে ভাঙন ও সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি ও অনিয়মের নানা অভিযোগের পাশাপাশি রাজু শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার মনোনয়ন পাওয়া অনেকটাই অনিশ্চিত বলে মনে করছেন দলীয় একাংশের নেতা-কর্মীরা।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফজাল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বড় দল ও বৃহৎ উপজেলা হিসেবে দলে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকা এবং দলীয় কোন্দল থাকাটা স্বাভাবিক। আমাদের দুর্বলতার সুযোগ বিরোধী দলগুলো নিতে পারে, এ জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কোন্দল-সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি এবং এরই মধ্যে চরাঞ্চলের সহিংসতা বন্ধ হয়েছে।’

মনোনয়নপ্রত্যাশী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃহৎ দল হিসেবে একাধিক প্রার্থী থাকাটাই স্বাভাবিক এবং এসব প্রার্থীরা আলাদা আলাদাভাবে মাঠে কাজ করলেও সবাই কিন্তু নৌকার পক্ষেই কাজ করছেন। এটাকে কোন্দল বলা যাবে না। দল যাকেই মনোনয়ন দিক না কেন কেন্দ্রের নির্দেশে রায়পুরায় দলীয় নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষেই কাজ করছেন।’

সাংসদ রাজি উদ্দিন আহম্মেদ রাজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রায়পুরায় আওয়ামী লীগে কোন্দলের প্রশ্নই আসে না। দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাধারণ জনগণ আমার সঙ্গে আছে। আর আমার সঙ্গে কারও কোনও বিরোধ নেই।’

তিনি বলেন, ‘নিলক্ষা ও বাঁশগাড়ী ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে চলা সহিংসতা ও দলীয় সমস্যা ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। আর সংসদ সদস্য হিসেবে আমি রায়পুরায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। আগামীদিনে দল আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে চিন্তা করবে— এমনটি আমি বিশ্বাস করি না। তারপরও দল যাকে মনোনয়ন দেবে আমি তাকেই সহযোগিতা করবো।’ 

 

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ