রাতের আঁধারে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে ইলিশ!

Send
এস এম রেজাউল করিম, ঝালকাঠি
প্রকাশিত : ০৮:০০, অক্টোবর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১০, অক্টোবর ১৪, ২০১৮






নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মা ইলিশ ধরছেন জেলেরাটানা ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধের নির্দেশ থাকলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সুগন্ধা ও রাজাপুর-কাঠালিয়ার বিষখালী নদীতে এখনও চলছে ইলিশ শিকার। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে এসব মাছ ধরে রাতের বেলায় বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন জেলেরা। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এসব এলাকার চার শতাধিক জেলে প্রতিদিন নদীতে ইলিশ শিকার করছেন। সরেজমিনে গিয়ে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, গোপনে দিনে ও রাতে নদী থেকে মা ইলিশ ধরছেন জেলেরা। তবে গোপনে ধরা মাছের দাম নেই খুব একটা। এক কেজি ওজনের প্রতিটি ইলিশ মাত্র ১০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাও জেলেরা গোপনে এগুলো পৌঁছে দিচ্ছেন ক্রেতাদের বাড়িতে।

রাজাপুর উপজেলার বড়ইয়া গ্রামের বিষখালী নদীতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের তত্ত্বাবধানে বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে প্রকাশ্যে ইলিশ শিকার। স্থানীয়রা বিষয়টি নিয়ে থানায় অভিযোগও করেন। কিন্তু, থানা থেকে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই মাছ ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যায়। এই এলাকায় কেউ অপরাধ করে ফেঁসে গেলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান সমঝোতা করে তাদের ছাড়িয়ে নেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে মনিরুজ্জামান সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি তার হস্তক্ষেপে অপরাধ করেও অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জেলার নলছিটি উপজেলার সুগন্ধা নদীর সরই, মাটিভাঙ্গা, ফেরিঘাট, নাইয়াপাড়া, খোঁজাখালী, অনুরাগ, দপদপিয়া পুরাতন ফেরিঘাট, ভবানিপুর, হদুয়া, বিষখালী নদীর ভেরনবাড়িয়া ও নলবুনিয়া খেয়াঘাট, রাজাপুর উপজেলার বড়ইয়া, বাদুরতলা এলাকার নদীতে ইলিশ শিকার বন্ধে সরকারি নজরদারি তেমন একটা নেই। ফলে নিষেধাজ্ঞার এই সময়েও উৎসবমুখর পরিবেশে ইলিশ মাছ ধরছেন জেলেরা। মাঝে মধ্যে সরকারিভাবে দুই-একটি ট্রলার দিয়ে টহল দেওয়া হয়। তবে এসব ট্রলার নদীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যাওয়ার আগেই খবর পেয়ে যান জেলেরা। ফলে তখন তারা সাবধান হয়ে যাচ্ছেন বা সটকে পড়ছেন।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন নদীতে মাছ ধরা খানিকটা কমে যাওয়ায় ঘণ্টাখানেক জাল পেতে রাখলেই প্রচুর মা ইলিশ ধরা পড়ছে। জেলেরা প্রতিদিন ইলিশ শিকার করে তা নির্বিঘ্নে বিক্রিও করছেন।

স্থানীয়রা জানান, সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এক শ্রেণির লোভী জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরছে। সকাল ১০টায়, দুপুর ৩টায়, রাত ১০টায় ও ভোর ৪টায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলছে এই মা ইলিশ নিধন কর্ম। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে যেভাবে অভিযান পরিচালিত হতো, এ বছর তেমনটা হচ্ছে না।

ঝালকাঠিতে নিষেধাজ্ঞা উপক্ষো করে চলছে মা ইলিশ শিকারএদিকে জেলেদের সহায়তার অভিযোগ উঠলেও তা অস্বীকার করেছেন রাজাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান মনির। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ এলাকায় কারা মাছ ধরে তাদের সম্পর্কে আমার জানা নেই। কার শেল্টারে (আশ্রয়-প্রশ্রয়ে) মাছ ধরে, তাও আমার জানা নেই। অভিযানের লোক চলে যাওয়ার পর অসাধু জেলেরা মাছ ধরতে নামে। তবে আগের চেয়ে এখন নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে মা ইলিশ ধরার প্রবণতা অনেক কমে গেছে।’

ইলিশ শিকারের সময় জালসহ দুই জেলেকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনায় স্থানীয় ওসি ক্ষিপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ও ভৈরবপাশা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি রাজিব হোসেন।

তারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে মাছ ধরার সময় দুই জেলেকে নৌকা ও জালসহ আটক করে নলছিটি থানার এসআই আজিজের হাতে তুলে দেই। এ সময় মৎস্য কর্মকর্তাও ছিলেন। আটক দুইজন হলো ভৈরবপাশা ইউনিয়নের জেলে সুমন ও জাকির। তখন নলছিটি ফেরীঘাটে পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল হালিম তালুকদারের উপস্থিতিতে তাদের জালও পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তদবির করলে আটক দুই জেলেকে ছেড়ে দেন ওসি। দুই জেলেকে আটক করায় উল্টো এলাকাবাসীর ওপর ক্ষেপে যান নলছিটি থানার ওসি শাখাওয়াত হোসেন।’

তবে নলছিটি থানার ওসি শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘থানায় এক জেলে শুভ নামে ছাত্রলীগের এক কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন তাকে মাছ ধরার জন্য শুভ চাপ দিয়েছেন। এসআই আজিজ তদন্ত করে দেখছেন। আটক দুই জেলের কথা আমি জানি না।’

নলছিটি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমাদের একটি মাত্র ট্রলার। জনবলও কম, তা দিয়ে অভিযান চালানো কষ্টসাধ্য।’

জেলা মৎস কর্মকর্তা বাবুল কৃষ্ণ ওঝা শনিবার বিকালে বলেন, ‘বর্তমানে দিয়াকুল, বাদুরতলা, জাঙ্গলিয়া, নলছিটি ফেরীঘাটে অভিযান চলছে। সাত দিনে ৫০টি অভিযান ও ২৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে, এক হাজার ১৪৫ কেজি ইলিশ ও এক লাখ ২৫ হাজার মিটার জাল আটক করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ১৩টি। জরিমানা করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া ১২ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।’

শনিবারও (১৩ অক্টোবর) রাজাপুর ও নলছিটিতে তিন জেলেকে মাছ ধরার সময় আটক করে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

 

/এনআই/টিটি/টিএন/

লাইভ

টপ