ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে: রাজশাহীতে ঐক্যফ্রন্ট

Send
রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০:৫৩, নভেম্বর ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১৮, নভেম্বর ০৯, ২০১৮

রাজশাহীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ থেকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়েছেন নেতারা। তারা বলেছেন, ‘এই অবৈধ সরকারের পতন ঘটাতে হবে। আপনারা মাঠেই থাকবেন। এই সরকার জগদ্দল পাথরের মতো ক্ষমতা আঁকড়ে বসে আছে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’

শুক্রবার (৯ নভেম্বর) সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘রাজশাহীর জনপ্রিয় নেতা আবু সাঈদ চাঁদ ভাই এখন পর্যন্ত বন্দি রয়েছেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের যত নেতাকর্মী গণতন্ত্র আন্দোলনের জন্য বন্দি রয়েছে, তাদের সবাইকে মুক্তি দিতে হবে। তাহলেই আলোচনা ফলপ্রসূ হবে। আমাদের পরিষ্কার কথা, নির্বাচনের জন্য সমান মাঠ তৈরি করতে হবে, সকল দলকে সমান অধিকার দিতে হবে। দেশনেত্রীকে মুক্তি দিয়ে তাকে কাজ করতে দিতে হবে। অন্যথায় কোনও নির্বাচন তফসিল গ্রহণযোগ্য হবে না, হবে না।’

সমাবেশে আগত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, ‘রাজশাহীর মঞ্চের জনতার কাছে প্রশ্ন- আপনারা লড়াকু মানুষ। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে লড়াই করে আসছেন। গণতন্ত্রের জন্য রাজশাহীর কত ভাইবোনের প্রাণ গেছে। তাদের রক্তের শপথ নিয়ে আমাদের লড়াই করে সফল হতে হবে। এখন একটাই প্রশ্ন- দেশে গণতন্ত্র থাকবে কিনা, এ দেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে কিনা, আমাদের কথা বলার অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকার থাকবে কিনা; এগুলোই এখন মৌলিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা কি তারেক জিয়াকে ফেরাতে চান, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে চান, গণতন্ত্র ফিরিয়ে জনগণের রায় প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাহলে আপনাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের মধ্যে তা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। দেশের পরিস্থিতি আজ বড়ই ভয়াবহ। পদে পদে নেতাকর্মীদের সমাবেশে যোগ দিতে বাধা দিয়েছে পুলিশ। পথ আটকে দিয়েছে। বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য, দেশনেত্রীর (খালেদা জিয়া) জন্য শত বাধা বিপত্তি উপক্ষো করে নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। আজ আমাদের নেত্রী আমাদের মাঝে নেই। তাকে কারাগারে আটকে রেখেছে স্বৈরাচারী সরকার। তাকে চিকিৎসা না দিয়ে জোর করে কারাগারের অন্ধকারে নিয়ে গেছে। সেখানেই আদালত বসানো হয়েছে। যেটি ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলে হয়নি। যে নেত্রী দেশের গণতন্ত্রের জন্য সারা জীবন অতিবাহিত করেছেন, একাত্তরে নির্যাতিত হয়েছেন, তাকে কারাগারে নিয়ে তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছে।’

এ সময় ফখরুল আরও বলেন, ‘গত ৫ বছর ধরে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলন চলছে। এই সরকার রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া। পুলিশ দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আজকে প্রমাণিত হয়েছে, দেশের মানুষ মুক্তি চায়। ভোটের অধিকার ফিরে পেতে চায়। মুক্ত বাংলাদেশ পেতে চায়। আমরা স্পষ্ট বলেছি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে বলেছিলেন, আমি দেশে কোনও সংঘাত চাই না, সহিংসতা চাই না। আমরা শান্তি চাই। শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা আন্দোলন করবেন। এবং বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলবেন। আজকে তারই নির্দেশে দেশের জনগণকে এক করে, সকল রাজনৈতিক দলকে এক করে গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য লড়াই করছি। এরই অংশ হিসেবে আমরা সরকারের সঙ্গে সংলাপে গিয়েছি। আমরা বলেছিলাম, নির্বাচনের আগেই পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে। বেগম জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। এটি না হলে সংলাপ ফলপ্রসূ হবে না। মিথ্যা মামলায় বেগম জিয়াকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। মিথ্যা মামলায় তারেক রহমানকে বিদেশে নির্বাসিত রাখা হয়েছে।’

আগামী নির্বাচনে জনজোয়ারে আওয়ামী লীগের নৌকা ভেসে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সন্ত্রাস ও সংঘাত এড়ানোর জন্য সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছিলাম। গত দশ বছর ধরে দেশে গণতন্ত্রের সংকট, বিচার বিভাগের সংকট ও আইনের শাসনের সংকট চলছে। মৌলিক অধিকার হারিয়েছে দেশের জনগণ। আমরা এগুলো ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। এনিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দুই দফা সংলাপে বসেছিল। আমরা সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছিলাম। কিস্তু সেই সংলাপ সফল হয়নি। কারণ, স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। আমাদের মৌলিক দাবি, সংসদ ভেঙে দিতে হবে। বেগম জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যে কথা দিয়েছিলেন, সেই কথাও রাখেননি। সংলাপের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার কথার বরখেলাপ করেছেন। একদিনেই ২ হাজার ২০০ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা ছাড়াই নির্জন কারাগারে পাঠিয়েছেন। সভা-সমাবেশ করতে দেননি। তারা কথা দিয়ে কথা রাখে না, এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করছে। তারা চোখেও দেখে না, কানেও শোনে না। আমরা এতদিন জানতাম তফসিল ঘোষণার পর সব রাজনৈতিক দল সমান অধিকার নিয়ে কাজ করবে। লেভেল প্লেইং ফিল্ড থাকবে। কিন্তু সরকারের তল্পিবাহক নির্বাচন কমিশন সেটি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। যতদিন দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন নির্বাচন কমিশনার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।’

বিএনপির স্থানীয় কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘এখন নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে শেখ হাসিনা আজীবন প্রধানমন্ত্রী আর বেগম খালেদা জিয়া আজীবন কারাবন্দি। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে তারেক রহমানকে আজীবন নির্বাসিত থাকতে হবে।’  

উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আরও বলেন, ‘এই মঞ্চে যারা আছেন, তাদের সাবেক বিচারপতি এসকে সিনকার মতো হাতে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেবে সরকার। আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে। এখন গণতন্ত্র নেই দেশে। এই গণতন্ত্র উদ্ধার করতে হলে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। বেগম জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সাত দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে না।’ গণতন্ত্রের যুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের নেতা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘এই সরকারের ভিত্তি হলো পুলিশ, ঘুষ, অনাচার ও দুর্নীতি, গায়েবি মামলা আর গ্রেফতার। কিন্তু তাদের ভিত নড়ে গেছে। তারা এখন পালানোর পথ খুঁজছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে বাস বন্ধ, যোগাযোগ বন্ধ, তারপরও আপনারা হেঁটে এসেছেন। আমরা আপনারা আন্দোলনে আছেন, আপনারা মাঠে থাকেন। আপনাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এবার আপনারা জয়ী হবেন, জয়ী হলে কী হবে? কৃষক শ্রমিকদের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। কৃষকের পণ্যের মূল্য নেই, শ্রমিকের শ্রমের মূল্য নেই। এসব প্রতিষ্ঠিত হবে। এখানে আজ যারা এসেছেন সবাইকে কি গ্রেফতার করা সম্ভব? সম্ভব নয়। তাহলে আপনারা মাঠে থাকেন। আপনাদের বিজয় নিশ্চিত। সরকার যত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করুক না কেন, ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের পরাজিত করতে হবে। জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত।’

নাগরিক ঐক্যর আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে একতরফা নির্বাচনি বৈতরণী পার করা সম্ভব নয়। ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বানচাল করতে চায় না। ৭ দফা দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত দেশে কোনও নির্বাচন হবে না। তফসিল বদলান, আমরা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারি সে জন্য ফাঁদ পাতছেন। তা হতে দেওয়া হবে না। পুলিশ গাড়ি আটকে দিচ্ছে। নাটোর, বগুড়া, রংপুরের গাড়ি আসতে দেওয়া হয়নি। প্রতিহিংসা বন্ধ করে সুষ্ঠু নির্বাচন দিন। ঐক্যফ্রন্ট যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সরকার সে ফাঁদ পেতেছে, তা হবে না। বগুড়া থেকে কাউকে আসতে দেয়নি।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বেগম জিয়াকে ছাড়া দেশে কোনও নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। সাত দফা দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত কেউ নির্বাচনে যাওয়ার চিন্তা করবেন না।’

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, ‘দেশকে একটি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে না চাইলে সাত দফা মেনে নিন।’ নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে দেশকে সংঘাতের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা কামাল হোসেন অসুস্থতার কারণে ঢাকা থেকে রাজশাহীতে আসতে না পারলেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জনসভায় উপস্থিতিদের উদ্দেশে কথা বলেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা সংলাপে গিয়ে নির্বাচনের তফসিল পেছানোর দাবি করেছিলাম, কিন্তু আমাদের কথা না শুনে তফসিল দিয়েছে। এ তফসিল সংবিধান পরিপন্থী। তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণার ফলে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে না।’

জনসভায় উপস্থিত হতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘পরবর্তী কর্মসূচিতে অবশ্যই রাজশাহী আসব।’

সমাবেশে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়ক মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে প্রধান বক্তা ছিলেন ঐক্যফ্রন্টের সদস্য সচিব ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সদস্য সুলতান মো. মনসুর আহমেদসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।

সমাবেশ পরিচালনা করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম মিলন।

 

 

 

/এএইচ/

লাইভ

টপ