যে কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলেন না এমপি গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস

Send
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২২:৪১, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০৮, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

মুহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস (ছবি– প্রতিনিধি)

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাননি বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) মুহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস। তার পরিবর্তে এ আসনে ক্ষমতাসীন দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক এমপি জিয়াউর রহমান। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দাবি, কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশপাশি তৃণমূলের সঙ্গে তেমন একটা যোগাযোগ না থাকা, সব কিছু আত্তীকরণ, গ্রুপিং, টাকা নিয়ে অন্য দলের লোকদের চাকরি দেওয়া–এমন নানা কারণেই গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের ভাষ্য, ‘আমার মনোনয়ন হাইজ্যাক করা হয়েছে। আমি সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়, এমন কাজ কাউকে করতে দেইনি। এতে তৃণমূলের যাদের স্বার্থ হাসিল হয়নি, তারা আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করছে।

তৃণমূলের নেতাদের একটা বড় অংশের দাবি, গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে তৃণমূলের। তিনি এলাকার তেমন একটা উন্নয়নও করতে পারেননি। তাকে এ আসনে মনোনয়ন দিলে জয় না পাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তার পক্ষে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা প্রচার-প্রচারণায় অংশও নিতো না।

এ ব্যাপারে নাচোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রক্ষা করতেন না। এমনকি, উপজেলার চার ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ওয়ার্ডের ৯০ জন সদস্যের সঙ্গেও তিনি কোনও যোগাযোগ রক্ষা করতেন না, তাদের পরামর্শ নিতেন না। তার কাছে বেশিরভাগ নেতাকর্মীর কোনও মূল্যায়ন ছিল না। এতে তৃণমূলে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে এবং এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দেয়।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের এই নেতার অভিযোগ, ‘সব কিছুকেই তিনি আত্মীয়করণের চেষ্টা করতেন। টাকার বিনিময়ে অন্য দলের লোকদের চাকরি দিতেন। শুধু তাই নয়, ক্ষমতার দম্ভে উপজেলা পরিষদের একজন জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও আমাকে উপেক্ষা করতেন। উপজেলায় কোনও উন্নয়নমূলক কাজে আমাকে ডাকা হতো না। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে আমি কোনও প্রোগামের আয়োজন করলে তিনি পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে তা ভণ্ডুল করে দিতেন।’

ভোলাহাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. আশরাফুল হক চুনু বলেন, ‘এলাকায় তেমন কোনও উন্নয়ন তিনি করতে পারেননি। এমপি কোটার বরাদ্দের বাইরে চোখে পড়ার মতো কোনও কাজই তিনি করতে পারেননি।’

গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের মনোনয়ন না পাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমার পক্ষে এটা বলা সম্ভব নয়। কারণ এটি সর্ম্পূণরূপে দলের হাই-কমান্ডের বিষয়। যেহেতু এবার নমিনেশন দেওয়ার ক্ষেত্রে, আমরা যতটুকু জানি, একাধিক জরিপ করা হয়েছে দলের পক্ষ থেকে।’

আশরাফুল হক চুনুর দাবি, ‘দলের মধ্যে গ্রুপিং-লবিং, বিরোধ-বিভাজন তৈরি করে রেখেছেন গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস ও জিয়াউর রহমান। আর এ কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীরা চেয়েছিলেন, তাদের দুই জনকে বাদ দিয়ে নতুন মুখ।’

ভোলাহাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতকে সবসময় তিনি (গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস) উপেক্ষা করতেন। বিষয়টি এমন যে, তিনি সবজান্তা শমসের। কারও কোনও পরামর্শের ধার ধারতেন না তিনি। তার আত্ম-অহঙ্কার খুব বেশি। সবকিছুতেই তিনি একগুয়ে।’

গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের মনোনয়ন না পাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘যতদূর আমি জানি, তিনি দলের নমিনেশন পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষমুর্হূতে জেলা আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রের কিছু নেতার সহায়তায় তা হাইজ্যাক হয়ে যায়।’

গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের মনোনয়ন না পাওয়ার ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রুহুল আমিন বলেন, ‘এ বিষয়ে কেন্দ্র ভালো জানে। স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ক্ষোভ থাকবেই। কেন্দ্র এবার নমিনেশন দেওয়ার ব্যাপারে একাধিক জরিপ করেছে। আর নেত্রী যাকে ভালো মনে করেছেন, তাকে জরিপের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে নমিনেশন দিয়েছেন। তবে কেন্দ্র যাকেই মনোনয়ন দিক না কেন; আমরা নৌকার বিজয় নিশ্চিতে কাজ করবো।’

এ ব্যাপারে গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস বলেন, ‘পার্লামেন্টারি বোর্ড আমাকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছিল। আর এ খবর জিয়াউর রহমান জেনে যাওয়ার পর জেলার নেতাদের নিয়ে ঢাকায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে নেত্রীকে ভুল বুঝিয়ে আমার মনোনয়ন ছিনিয়ে নেয়। তারা নেত্রীকে আমার সম্পর্কে বলেছেন, আমি ভালো। তবে দলের বাইরে বিরোধী শিবির থেকে ভোট আনতে পারবো না, যা জিয়াউর রহমান পারবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ নিয়ে আমি সরাসরি নেত্রীর সঙ্গে কথা বলি এবং জানাই যে, ব্যক্তি ইমেজে আমার ছাড়া কেউ বিরোধী শিবির থেকে বেশি ভোট আনতে পারবে না। তখন নেত্রী আমাকে পুর্নবিবেচনায় রেখেছিলেন। যার কারণে আমি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। যদিও দলীয় মনোনয়নপত্র না থাকায় জেলা রির্টানিং কর্মকর্তা তা বাতিল করেছেন।’

গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস দাবি করেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করেছেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা। যে কাজটা করলে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে, তেমন কাজ আমি কাউকে করতে দিইনি। অনেকের অন্যায় আবদার মেনে নেইনি। এতে যাদের স্বার্থ হাসিল হয়নি, তারা বলছে, আমি তাদের মূল্যায়ন করিনি।’

তিনি বলেন, ‘দলীয় মনোনয়ন পাওয়া জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার আদর্শিক দ্বন্দ্ব রয়েছে; ব্যক্তিগত কোনও দ্বন্দ্ব নেই। তবু শেষপর্যন্ত আমি দলীয় মনোনয়ন না পেলে দলের জন্য, নৌকার জন্য এবং দলীয় প্রার্থীর জন্য কাজ করবো।’

 

/এমএ/টিএন/

লাইভ

টপ