সাদুল্যাপুরে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘আটক-বাণিজ্যের’ অভিযোগ

Send
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১১:৫০, জানুয়ারি ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫৯, জানুয়ারি ১২, ২০১৯

 

গাইবান্ধা জেলা

গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে আটক-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিনই কোনও না কোনও এলাকা থেকে নিরীহ মানুষকে আটক করে স্বজনদের কাছে টাকা দাবি করছে পুলিশ৷ টাকা আদায়ের পর আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর কেউ টাকা দিতে না পারলে মাদক বা অন্য কোনও মামলায় ফাঁসিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সম্প্রতি কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে৷

পুলিশের এমন আটক-বাণিজ্যে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। পুলিশের এ আটক-বাণিজ্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন সাদুল্যাপুর থানা পুলিশের কর্মকর্তারা। 

বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের এসআই ও এএসআইয়ের একাধিক সোর্স রয়েছে। এসব সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ নিয়মিতই আটক-বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ও স্বজনদের। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে সখ্যতার সুযোগে এসব কথিত সোর্সরাও গ্রামের নিরীহ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৯ ডিসেম্বর রাতে এএসআই রবিউল ইসলাম দুই-তিনজন পুলিশ নিয়ে সাদুল্যাপুরের জামালপুর ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামে ব্যবসায়ী গোলাম হোসেনের ছেলে কুদ্দুসকে (৩০) নিজ বাড়ির ঘর থেকে ডেকে তুলেন। এরপর তার পকেটে দুই পিস ইয়াবা ঢুকিয়ে দেয়। পরে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে তাকে থানায় নিয়ে রাতভর আটকে রাখে। পরে স্বজনদের সঙ্গে ৪০ হাজার টাকা রফাদফা হলে কুদ্দুসকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় । 

ভুক্তভোগী কুদ্দুসের অভিযোগ,‘তিনি ব্যবসায়ী। ঘটনার দিন তিনি ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন।পুলিশ তাকে ফাঁসাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলে পকেটে ইয়াবা দেয়। পরে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পর থানা থেকে ছাড়া পান।’ 

এছাড়া এএসআই রবিউলের বিরুদ্ধে দাউদপুর গ্রামের মৃত বণিজ মিয়ার ছেলে মজনু মিয়াকে নারী ঘটিত বিষয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবির অভিযোগ রয়েছে।

গত ৫ জানুয়ারি রাত ৩টার দিকে দামোদরপুর ইউনিয়নের জামুডাঙ্গা গ্রামের খাজা ও বাদশার বাড়িতে অভিযান চালায় এসআই আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল। এসময় পুলিশ খাজা ও বাদশা দুই ভাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেন। এরপর তারা দুজনে ইয়াবা ব্যবসা করে বলে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে আসে। রাতভর থানায় রেখে পরদিন সকালে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

ভূক্তভোগী খাজা মিয়ার অভিযোগ করে জানান, 'পুলিশ তাদের প্রতিপক্ষের কাছে প্রভাবিত হয়ে দুইভাইকে আটক করে। তাদের ফাঁসাতে পকেটে ইয়াবা দিয়ে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এসময় মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে পুলিশ। তবে ওসি তাদের সঙ্গে কথা বলে মিথ্যা অভিযোগ বুঝতে পারেন এবং ছেড়ে দেন। এসময় ওসি মিথ্যা অভিযোগ দেওয়ার কারণে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু ঘটনার দু’দিন পার হলেও অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ব্যবস্থা না নেওয়া হলেও এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করবেন বলে তিনি জানান।’ 

এছাড়া গত ৬ জানুয়ারি দুপুরে থানার এসআই সাইফুল ইসলাম ও মিনহাজ সাদুল্যাপুর শহরের ব্যবসায়ী ও দামোদরপুর ইউপি সদস্য খোরশেদ আলমকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে আটক করে।

এ ব্যাপারে পুলিশের দাবি, সড়কে তার মোটরসাইকেল পুলিশ সদস্যর গায়ে লাগে এবং সে এক পুলিশ সদস্যকে গালি দেয়। অন্যদিকে খোরশেদ মিয়ার অভিযোগ, কোনও দোষ না থাকলেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এসে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। পরে হাতে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে মারধর করতে করতে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। পরবর্তীতে তার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা থানা গিয়ে ওসির সঙ্গে কথা বলে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।

অপরদিকে, গত ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তফবাজিত এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ২৮৬ জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। মামলার পর থেকে গ্রেফতারের ভয়ে তরফবাজিত ও হামিন্দপুর গ্রামসহ কয়েক গ্রামে পুরুষ শূণ্য হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, পুলিশ তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং টাকা দাবি করছে। গ্রামের অনেকেই পুলিশকে টাকাও দিয়েছেন। তারপরও এলাকার মানুষ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

গত ১৫ ডিসেম্বর পুলিশের একটি দল দামোদরপুরে চান্দেরবাজারের একটি ক্লাব থেকে তাস খেলার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করে। পরে ৫ হাজার টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ইউপি সদস্য তোতা মিয়া। তিনি বিষয়টি থানার ওসিকে জানালেও টাকা ফেরত কিংবা এর প্রতিকার পায়নি।

এছাড়া ছান্দিয়াপুর বটতলী এলাকায় গত ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাস খেলার অভিযোগে একটি ঘর থেকে পাঁচজনকে আটক করে। পরে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে পথেই সাইফুল নামে একজনকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরআগে, দামোদরপুর ইউনিয়নের জামুডাঙ্গা গ্রামের ঘাঘট ব্রিজের পাশের বাড়ির মালিক নজরুল ইসলামের অভিযোগ, কয়েকদিন আগে তিন পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালায়। অভিযানে বাড়িতে কিছু না পেলেও তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করে। পরে ভয়ে তার বাবা-মা পুলিশের হাতে ৩ হাজার টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এসব ছাড়াও পুলিশের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল আটক-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। রেজিস্ট্রেশনসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র থাকলেও মোটরসাইকেল চালকদের নানাভাবে হয়রানি করছে পুলিশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চালকের অভিযোগ, সব কাগজ ঠিক থাকলেও পুলিশ মোটরসাইকেল আটক করছে। তাদের দাবি অনুযায়ী টাকা দিলে মোটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়া হয় আর টাকা না দিলে হয়রানি করা হয়। 

পুলিশের এমন আটক-বাণিজ্যে অব্যহত থাকলেও গত দুই মাসের মধ্যে পুলিশ উল্লেখযোগ্য কোনও মামলার আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এনায়েতপুর ও দাউদপুরে হাবিব ও রাসেল নামে দুই ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন মাস হলেও হত্যার রহস্য উদঘাটন কিংবা প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেফতার করতে পারেনি। এছাড়া মহিষবান্দি, ছান্দিয়াপুর, মিরপুর বাজার, ধাপেরহাট, বকশিগঞ্জ, বউবাজার ও খোদ্দকোমরপুরসহ বেশ কয়েকটি চিহ্নিত স্থানে দিনরাত ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসা চললেও পুলিশ নিরব। মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পুলিশ দৈনিক ও মাসিক চুক্তিতে টাকা আদায় করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাদুল্যাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরশেদুল হক। তিনি বলেন, 'সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ আসামি গ্রেফতার করছে। নিরীহ ও নিরঅপরাধ কাউকে আটক করা হচ্ছে না এবং কারো কাছ থেকে কোনও টাকা আদায় করা হয়নি। তারপরও কেউ অভিযোগ দিলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে অভিযোগের বিষয়ে (এসআই) সাইফুল ইসলামের মুঠোফোনে কথা হলে অভিযোগ এড়িয়ে গিয়ে বলেন,‘ভাই অভিযোগ আর কি, আসেন সন্ধ্যায় এক সঙ্গে চা খাব।’

সবমিলিয়ে 'পুলিশ' এখন সাদুল্যাপুরের মানুষের কাছে আতষ্ক। পুলিশের কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও। এসবের প্রতিকারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাদুল্যাপুরবাসী।

 

/জেবি/

লাইভ

টপ