টিনের দাম কম, তাই বাজার নেই গোলপাতার

Send
আবুল হাসান, মোংলা
প্রকাশিত : ১৮:৫৪, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৬, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৯

গোলের বন

নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুম। কয়েক বছর আগেও এই সময়জুড়ে অনেক ব্যস্ত সময় কাটাতেন সুন্দবন এলাকার বাওয়ালিরা। উপকূলে গোলপাতার ঘরের প্রচলন থাকায় এর চাহিদাও ছিল বেশ। সময়ের আবর্তনে দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন টিনের ঘরের প্রচলন বাড়ায় পড়ে গেছে গোলপাতার বাজার। এবার মৌসুম শেষের দিকে চলে এলেও বাওয়ালিদের তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। গোলপাতা সংগ্রহে আগ্রহ কমে গেছে তাদের।  

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বনবিভাগের কড়াকড়ির কারণে গত কয়েক বছর থেকেই গোলপাতা সংগ্রহে বাওয়ালিদের আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। তারমধ্যে এখন টিনের দাম অনেক কম হওয়ায় গোলপাতার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে স্থানীয়দের। গোলপাতার চাইতে টিন সস্তা ও টেকসই হওয়ায় মানুষ এখন টিন দিয়েই ঘর বানাচ্ছেন।  

এই ব্যাপারে শহরের মাদ্রাসা রোডের গোলপাতা ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান বলেন, ‘খুব ছোট আকারের (সাড়ে সাত ফুট বাই সাড়ে সাত ফুট) একটা ঘরের জন্য ৫ হাজার টাকার গোলপাতা লাগে, কিন্তু ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকার টিন হলেই একই আকারের ঘর বানানো যায়। তাছাড়া প্রতি দুই-তিন বছর পর পর গোলপাতা বদল করতে হয়, কিন্তু টিন অনেক বছর টেকে। একারণে মানুষ এখন গোলপাতার বদলে টিন দিয়ে ঘর বানাচ্ছে। গোলপাতার বাজার আগের মতো নেই। এছাড়া বিভিন্ন নিয়মের বনবিভাগের কড়াকড়ির কারণেও গোলপাতা সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন বাওয়ালিরা।’

বাওয়ালিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একেবারে দরিদ্র মানুষরা এখনও গোলপাতার ঘর ব্যবহার করছেন। এই সংখ্যা অনেক কম। পুরনো পেশা টিকিয়ে রাখতে অল্প সংখ্যক বাওয়ালি এখনও এই পেশায় (গোলপাতা সংগ্রহ) আছেন।  

গোলের বন

এদিকে মোংলা শহরের মাদ্রাসা রোডের গোলপাতা ব্যবসায়ী ইমন হোসেন, কুমারখালীর শাহজাহান ও মাকড়ঢোনের আবুল মৃধা বলেন, ‘গোলপাতার ব্যবসার জন্য বাওয়ালিদের প্রচুর টাকা দাদন দিতে হয়। দাদন নিয়েও তারা বন থেকে কেটে আনা গোল ঠিকমত আড়তে দেন না। এছাড়া বাওয়ালিরা নিয়মমতো পাতা না কাটায় বাজারে সেগুলোর চাহিদাও থাকে না। এসব কারণে ব্যবসায়ীরাও নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।’

এই ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, ‘আগে গোলপাতা বহনকারী নৌকার দুই পাশে ঝুল (ভারসম্য) হিসেবে বনের বিভিন্ন ধরনের গাছ কেটে আনা হতো। কিন্তু এখন সেগুলো কাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে ঝুল হিসেবে দেশীয় গাছ কেটে নিয়ে সঙ্গে করে যাওয়া-আসার কারণে খরচও বাড়ছে ব্যবসায়ীদের। এসব কারণে গোলপাতার ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তারা। মোংলা শহরে হাতে গোনা দুই-একজন আড়তদার তাদের ব্যবসা ধরে রেখেছেন।’

এসব বিষয়ে পূর্ব সুন্দরবনের বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে শরণখোলা, চাদপাই ও শ্যালা নামক স্থানে তিনটি গোলপাতা কূপ রয়েছে। এরমধ্যে শরণখোলার ৯৫ ভাগ এলাকাই অভয়ারণ্য ঘোষিত হওয়ায় সেখানে মাছ ও গোলপাতাসহ সব ধরনের বনজসম্পদ আহরণে সরকারের পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাই এই কূপ থেকে গত তিন বছর ধরে গোলপাতা আহরণ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া অন্য দুই কূপে গোলপাতা আহরণের জন্য পারমিট দেওয়া হচ্ছে বাওয়ালিদের। এখন পর্যন্ত শ্যালা কূপে ৪১টি নৌকার পাস দেওয়া হয়েছে। এই কূপের গোলপাতা সংগ্রহ শেষ হওয়ার পর চাদপাই কূপের পাস দেওয়া হবে।

গোলের বন

বনবিভাগের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, মূলত নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণের মৌসুম। কিন্তু নানা কারণে এবার বাওয়ালিরা বেশ দেরিতে গোলপাতা কাটার কাজ শুরু করেছেন।

বনবিভাগের চাদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহিন কবির বলেন, ‘আগে বড় বড় নৌকা নিয়ে এসে বাওয়ালিরা পারমিট ছাড়াই অতিরিক্ত গোলপাতা কেটে নিতেন। এতে তারা অধিক লাভবান হলেও বনবিভাগ প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতো। যার ফলে গত বছর থেকে বড় নৌকা বাদ দিয়ে শুধু ১৪ মিটার দৈর্ঘ্যের নৌকার ব্যবহার করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বনের কোনও গাছ না কেটে দেশীয় গাছ বা কাঠ দিয়ে নৌকার ঝুল ব্যবহারের ওপর নিয়ম করায় বাওয়ালির সংখ্যা এবার কিছুটা কম।’

গোলপাতা সংগ্রহে বাওয়ালির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘তুলনামূলকভাবে গোলপাতার চেয়ে টিনের দাম কম। তাছাড়া দুই বছর পর পর গোলপাতা পাল্টাতে হয়। কিন্তু টিনের ব্যবহার দীর্ঘস্থায়ী। একারণে গোলের বাজার আগের মতো নেই। এটা অন্যতম একটা কারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে ঘরবাড়িতে গোলের ব্যবহার হতো, এখন এর ব্যবহার উঠে গেছে বললেই চলে। শুধু প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষরাই এর ব্যবহার ধরে রেখেছেন। আর ধনীরা এখন গোলপাতা ব্যবহার করছেন চিংড়ির ঘেরের ঘরে।’

 

/এএইচ/

লাইভ

টপ