উপকূলীয় পতিত লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী ও গম চাষে সাফল্য

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
০৪ এপ্রিল ২০১৯, ০৭:৫০ আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৩৮

দাকোপের পানখালির গবেষণা প্লটে প্রস্ফুটিত সূর্যমুখী

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল খুলনার পতিত জমিতে গম ও সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকরা বিঘাপ্রতি ছয় থেকে আট হাজার টাকা লাভ করতে পারবেন বলে গবেষকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে লবণাক্ত জমিকে চাষাবাদের আওতায় আনতে গবেষণা করে চলেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন। এরই ধারাবাহিকতায় দাকোপের পানখালিতে রোপা আমন ধান কাটার পর রবি মৌসুমে সূর্যমুখী ও গম চাষে সফল হয়েছেন এই ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. এনামুল কবীর এবং উপ-গবেষক সহকারী অধ্যাপক বিধান চন্দ্র সরকার। দাকোপের পানখালিতে ১০ বিঘা (প্রায় ১.৫ হেক্টর) জমিতে দুটি গবেষণা প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তীব্র লবণাক্ততার কারণে রোপা আমন ধান দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের একমাত্র ফসল। এ এলাকার কৃষকরা সাধারণত দেরিতে পাকে এমন স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করে থাকেন। এসব জাতের ফলন অন্যান্য উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলনায় অনেক কম। আমন ধান কাটার পর এ এলাকার অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। কারণ দেরিতে আমন ধান কাটার ফলে কৃষক উপযুক্ত সময়ে রবি ফসলের বীজ বপন করতে পারেন না। এছাড়া ধান কাটার পর জমিতে অতিরিক্ত রস থাকায় সঠিক সময়ের মধ্যে বীজ বপন করতে না পারা অরেকটি প্রধান কারণ।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণে খুবিসহ বাংলাদেশ, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান দুটি সমন্বিত গবেষণা প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ এবং বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন কেজিএফের যৌথ অর্থায়নে এই প্রকল্পের কাজ চলছে।

প্রকল্পের উপ-গবেষক সহকারী অধ্যাপক বিধান চন্দ্র সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথম প্রকল্পে আমরা নির্বাচন করার চেষ্টা করেছি– এখানে রবি মৌসুমের কোন কোন ফসল চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত এবং এ পরিবেশে সেগুলো টিকে থাকবে কি না। আমরা অনেক ফসল নিয়ে কাজ করেছি– গম, সরিষা, সূর্যমুখী, ভুট্টা, মটর ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সূর্যমুখী ও গম (তিন বছর) সফলভাবে চাষ করা সম্ভব হয়েছে। এরপর সূর্যমুখী ও গমের সার ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য চাষাবাদ কৌশল নিয়ে আমরা দ্বিতীয় প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি।’

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক পঙ্কজ কান্তি মজুমদার বলেন, ‘এই লবণাক্ত অঞ্চলে চাষ করা সম্ভব এমন একটি ফসল হচ্ছে সূর্যমুখী। এর ফুল ধারণের ওপর দিনের দৈর্ঘ্য ও মৌসুমের কোনও প্রভাব নেই, দেরিতে লাগালেও হচ্ছে। এর মূল মাটির গভীর থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না লাগালে ফুল ফুটবে না এমন কোনও বিষয় নেই। এজন্য এটি রবি, খরিফ-১ ও খরিফ-২ এই তিন মৌসুমেই করা যাবে। তবে রবি মৌসুমে এর ফলন বেশি। এতে করে কৃষক এবং সর্বোপরি সরকার লাভবান হবে। কাজেই সূর্যমুখী এ অঞ্চলের জন্য একটি কার্যকরী ফসল বলে আমি মনে করি।’

মুখ্য গবেষক অ্যধাপক ড. মো. এনামুল কবীর বলেন, ‘সূর্যমুখী ও গম এখানে হবে তা বিগত কয়েক বছরের গবেষণায় আমরা নিশ্চিত। রোপা আমন কাটার পর মাটিতে যে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকে এমন অবস্থায় মাটিতে বিনাচাষে সূর্যমুখী ও গম দিলে সেটা গজাচ্ছে। কিন্তু অন্য ফসল সেটা সহ্য করতে পারে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা মারা যায়। রবি মৌসুমে সূর্যমুখী ও গম চাষের নতুন প্রযুক্তি (সার, পানি, লবণাক্ততা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা) কৃষকদের দিতে পারলে এই এলাকায় রোপা আমনের সঙ্গে তারা অতিরিক্ত একটি ফসল পাবে এবং আর্থিকভাবে লাভবান হবে। সূর্যমুখী চাষ ভোজ্য তেলের ঘাটতি পূরণেও ভূমিকা পালন করবে এবং কৃষকরাও সূর্যমুখীর তেল ব্যবহার করতে পারবেন।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এ অঞ্চলে সূর্যমুখী ও গমের ভালো ফলন পেতে উচ্চ ফলনশীল এবং স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন আমন ধান একটু আগে লাগাতে ও কাটতে হবে। এরপর মাটিতে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকা অবস্থায় বিনা চাষে সূর্যমুখী ও গমের বীজ বপন করে, এমনকি সূর্যমুখীর চারা রোপণ করেও চাষ করা যায়। এতে লবণাক্ততা তীব্র হওয়ার আগেই ফসল কাটার উপযোগী হয়।’

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল প্রকাশিত ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন গাইডে সূর্যমুখীর কোনও ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন এ অঞ্চলের জন্য নেই। এই প্রকল্প দুটির সফল সমাপ্তির পর এই অঞ্চলের জন্য সূর্যমুখী ও গমের একটি সুনির্দিষ্ট সার ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য চাষাবাদ কৌশল প্রতিষ্ঠা করা যাবে এবং কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।

পানখালির কৃষক শংকর প্রসাদ বলেন, ‘সূর্যমুখী ও গম চাষের ফলে আমরা রোপা ধানের সঙ্গে অতিরিক্ত একটি ফসল পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও পাব। এই সূর্যমুখী ও গম চাষের ফলে আমরা লাভবান হব এবং তাতে আমরা অনেক খুশি।

/এমএএ/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
জন্মদিনে শিক্ষার্থীদের একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর
জন্মদিনে শিক্ষার্থীদের একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর
গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়লেন চালক, দুর্ঘটনায় নিহত ৮
গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়লেন চালক, দুর্ঘটনায় নিহত ৮
ট্রেনে ওয়াশরুম ব্যবহারে সংক্রমণ এড়াবেন কীভাবে?
ট্রেনে ওয়াশরুম ব্যবহারে সংক্রমণ এড়াবেন কীভাবে?
লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব উদ্বোধন আজ
লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব উদ্বোধন আজ
সর্বাধিক পঠিত
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
পঞ্চগড়ের কোথায় দাঁড়ালে দেখা মিলবে কাঞ্চনজঙ্ঘার?
পঞ্চগড়ের কোথায় দাঁড়ালে দেখা মিলবে কাঞ্চনজঙ্ঘার?
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ