পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে মাদ্রাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

Send
ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৬:০১, এপ্রিল ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, এপ্রিল ০৬, ২০১৯

সোনাগাজীর ওই মাদ্রাসা ছাত্রী

ফেনীতে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ডেকে নিয়ে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে (১৮) আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শনিবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে সোনাগাজী ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ছাদে এই ঘটনা ঘটে। ওই শিক্ষার্থীর শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়।

ভুক্তভোগী ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা গত ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। পরে এই ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলে তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে পুলিশ হয়রানির অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে। এরপর থেকে অধ্যক্ষ কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ওই ছাত্রী এবং তার পরিবারকে চাপ দিতে থাকে অধ্যক্ষের লোকজন। এর জের ধরেই পরীক্ষা হল থেকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন লাগিয়ে ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে অধ্যক্ষের লোকজন।

তবে শিক্ষার্থীর গায়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও পাওয়া যাচ্ছে। মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী দাবি করছেন, শনিবার সকাল ৯টায় ওই ছাত্রী আলীম পরীক্ষায় অংশ নিতে পরীক্ষার হলে দ্বিতীয় তলার ৮ নম্বর কক্ষে আসেন। হলে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর তিনি টেবিলে প্রবেশপত্র ও কলম স্কেল রেখে হল থেকে বের হয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পরে মাদ্রাসার ছাদে তার চিৎকার শুনতে পাওয়া যায়। পরে জানা যায়, আগুনে পুড়ে গেছে নুসরাত। তবে কীভাবে আগুন লেগেছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন তারা। তাদের ধারণা ওই ছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

পরীক্ষার হলের পরিদর্শক কবির আহমেদ জানান, ‘পরীক্ষার ১০ মিনিট আগে হলে যাই। প্রশ্নপত্র বিলির সময় টেবিলে প্রবেশপত্র দেখতে পাই, কিন্তু পরীক্ষার্থীকে দেখিনি।’ 

কেন্দ্র সচিব নূরুল আফসার ফারুকি বলেন, ‘ঘটনা শোনার পর ছাদে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি নাইটগার্ড মোহাম্মদ মোস্তফা ও পুলিশ কনস্টেবল মোহাম্মদ রাসেল আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন। পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।’ তবে কীভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটল সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

সোনাগাজী হাসপাতালের কর্মকর্তা নূরুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘গুরুতর আহত অবস্থায় ওই ছাত্রীকে হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। ওই ছাত্রীর শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।’ 

সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন বলছেন, ‘পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। এই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করা হবে।’

সোনাগাজীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহেল পারভেজ জানান, ‘ঘটনা শোনার পরপরই ঘটনাস্থলে যাই। কীভাবে ঘটনা ঘটল তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। ঘটনাস্থল থেকে কেরোসিনের বোতল ও কিছু পলিথিন উদ্ধার করা হয়েছে।’

এই প্রসঙ্গে ফেনীর সোনাগাজী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাইকুল আহেম্মদ ভুঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নাসরিন জাহান সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যায়। সে যে কক্ষে পরীক্ষা দিচ্ছে, সেই কক্ষে ওই সময় ২৪ জন শিক্ষার্থী ছিল। নাসরিন জাহান তার প্রবেশপত্র ও ফাইল নিজের সিটে রেখে পাশের মেয়েদের বলে যে, আমি একটু বাহির থেকে আসতেছি। এরপর সে কক্ষ থেকে বের হয়ে পাশের একটি সাইক্লোন সেন্টারের (কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়) ওপরে ওঠে, সেখানে মেয়েদের জন্য ওয়াস রুম রয়েছে। সেখানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সে আগুন আগুন বলে চিৎকার করে দোতলায় চলে আসে। এসময় তার গায়ে আগুন জ্বলছিল। তখন স্কুলের পিয়ন ও অন্যান্য শিক্ষার্থীরা মাটি-পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। আগুন নেভানোর পর তাকে দ্রুত ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেসময় পুলিশ তার সঙ্গে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই কেন্দ্রে পরীক্ষা চলছিল, সেখানে বাহিরের কারও প্রবেশের সুযোগ ছিল না। কারা বা কীভাবে মেয়েটির গায়ে আগুন লাগলো তা স্পষ্ট না। মেয়েটি কথা বলতে পারছে না। তবে ছাত্রীটি নাকি চার জন বোরকা পরা লোক দেখেছিল বলে ফেনী হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বলেছে।’

এই ঘটনায় একজন শিক্ষক ও ছাত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সোনাগাজী থানায় নিয়েছে পুলিশ। এই ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে অধ্যক্ষ গ্রেফতারের ঘটনায় গত কয়েক দিন ধরে অধ্যক্ষের পক্ষে-বিপক্ষে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করছেন। এই ঘটনাকে ঘিরে মাদ্রাসা কমিটির সাবেক ও বর্তমান কমিটির সদস্য স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মামুন এবং মকসুদ আলমের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

 

 

/এসএসএ/এআরআর/এএইচ/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ