মাদ্রাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা পরিবারের দাবি, নিরাপত্তাহীনতার কথা আগেই প্রশাসনকে জানানো হয়েছিলো

Send
রফিকুল ইসলাম, ফেনী
প্রকাশিত : ১৯:১১, এপ্রিল ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০০, এপ্রিল ০৮, ২০১৯

ফেনীর দগ্ধ সেই মাদ্রাসাছাত্রী

অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে (২৭ মার্চ) মামলা দায়েরের পর থেকে দুর্বৃত্তদের অব্যাহত হুমকিতে নিরাপত্তাহীন ছিল ফেনীর সোনাগাজীর অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীর পরিবার। এমন অভিযোগ করে ওই মাদ্রাসাছাত্রীর ভাই বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মামলা করার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা স্থানীয় পুলিশ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পৌর মেয়র ও জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন তারা।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভিকটিম ও তার পরিবারের মানসিক অবস্থা ঠিক রাখতে কাউন্সেলিং দেওয়া হয়েছে।

লাইফ সাপোর্টে থাকা ওই ছাত্রীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোমবার (৮ এপ্রিল) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে দুর্বৃত্তরা আমার বোনকে চাপ দেয় এবং আমাদের পরিবারকে নানা ভয়ভীতি দেখায়। দুর্বৃত্তরা ওই মাদ্রাসার ছাত্র– নূরউদ্দিন, শামীম, জাভেদ ও মহিউদ্দিন শাকিল। তাদের প্রশ্রয়দাতা স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা মকসুদুর রহমান। তিনি ওই মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস আমাদের ছিল না।’
নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার বিচারের দাবিতে ২৮ মার্চ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মানববন্ধন করেন। এরপর দুর্বৃত্তরা অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়ে পাল্টা মানববন্ধন করে আমাদের হুমকি দেয়। সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হুমকির বিষয়টি আমরা সোনাগাজী মডেল থানা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং পৌর মেয়রকে জানাই। তারা আমাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। এরপর উৎকণ্ঠার মধ্যেই আমার বোন ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া আলিম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য সেখানে যায়।’

বোনকে দগ্ধ করার ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘ঘটনার দিন শনিবার (৬ এপ্রিল) সকালে বোনের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা ছিল। তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাই। তবে কেন্দ্রের প্রধান ফটকে আমাকে আটকে দেন নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা। এরপর আমার বোন একাই হেঁটে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এ সময় কেন্দ্র থেকে একটু দূরে আসার ১৫-২০ মিনিট পরই মোবাইল ফোনে বোনের অগ্নিদগ্ধের খবর পাই। ফের কেন্দ্রে ছুটে গিয়ে বোনকে দগ্ধ অবস্থায় দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’
তিনি বলেন, ‘বোনের ওপর অধ্যক্ষের যৌন নির্যাতনের বিচার চেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় পড়লাম আমরা। তখন পাশে কাউকে পাইনি। দুর্বৃত্তদের কেরোসিনের আগুনে আমার বোন যখন জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে, তখন সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু ঘটনার আগে বোনের জীবনের নিরাপত্তা কেউ দিতে পারলো না।’

এ বিষয়ে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সোনাগাজী পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলেন, ‘অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা যৌন হয়রানির মামলার পর থেকে ওই মাদ্রাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার আগে পরিবারটি তাদের উৎকণ্ঠার কথা আমাকে জানিয়েছিল। এ নিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছি। কিন্তু কী কারণে এমন আলোচিত ঘটনায় ভিকটিমকে নিরাপত্তা দিতে আমরা ব্যর্থ হলাম তা বুঝতে পারছি না।’
এ ঘটনায় জড়িতদের প্রসঙ্গে মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, ‘অধ্যক্ষকে রক্ষা করতে যারা মানববন্ধন করেছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। ওই ছাত্রীর বর্ণনা মতে, তাকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টাকারীরা ওই মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।’

সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার পর কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পুলিশকে অভিযুক্ত করে এমন অভিযোগ করতে পারেন। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় ভিকটিমকে উদ্ধার করতে পুলিশ কনস্টেবল রাসেল আহত হয়। পুলিশই প্রথম ভিকটিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের এক কনস্টেবল আহতও হয়।’

ওসি আরও বলেন, ‘এই ঘটনার আগে মাদ্রাসাছাত্রীর নিরাপত্তাহীনতার কোনও বিষয়ে সে (ওই ছাত্রী) বা তার পরিবার পুলিশকে অবগত করেনি। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভিকটিমের পরিবারের মানসিক অবস্থা ঠিক রাখতে কাউন্সেলিং দিয়েছে পুলিশ।’

ভুক্তভোগী মাদ্রাসাছাত্রী সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরছান্দিয়া গ্রামের মাওলানা একেএম মানিকের মেয়ে। অভিযোগ আছে, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা এর আগে ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করে। এ কারণে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা বর্তমানে ফেনী কারাগারে আছেন।

আরও পড়ুন:

ফেনীর সেই মাদ্রাসাছাত্রীর চিকিৎসায় ৮ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড

ছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা: সোনাগাজী মাদ্রাসায় পাঠদান স্থগিত, অধ্যক্ষ সাময়িক বরখাস্ত

লাইফ সাপোর্টে ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী

‘অগ্নিসংযোগকারীদের পরনে ছিল বোরকা, হাতমোজা ও কালো চশমা’

/এমএএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ