নুসরাত হত্যা কাউন্সিলর মাকসুদকে আ.লীগ থেকে বহিষ্কার, রিমান্ড শুনানি সোমবার

Send
ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০১:৪৬, এপ্রিল ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:১১, এপ্রিল ১৩, ২০১৯

মাকসুদ আলমফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার নম্বর আসামি কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে (৪৫) আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার (১২ এপ্রিল) রাতে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এদিকে সোমবার (১৫ এপ্রিল) মাকসুদের রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার আসামি হিসাবে এজাহারভুক্ত হওয়ায় মাকসুদ আলমকে দল ও পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মাকসুদ চরগণেষ এলাকার মৃত আহসান উল্যাহর ছেলে। তিনি সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। একইসঙ্গে ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সদস্যও ছিলেন মাকসুদ। নুসরাত এই মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিলেন।

বহিষ্কারের বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রহুল আমীন বলেন, ‘নির্মম একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাকসুদ আলমের জড়িত থাকার অভিযোগ দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় ফেনীর মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন পিবিআই’র উপ-পরিদর্শক ও মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম। পরে জ্যেষ্ঠ বিচারক তানিয়া ইসলাম আগামী সোমবার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করেন। ফেনী পিবিআই'র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে শুক্রবার সকালে পিবিআই’র একটি দল রাজধানীর ফকিরাপুলের একটি আবাসিক হোটেল থেকে মাকসুদকে গ্রেফতার করে।

গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা আলিম পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগাম দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেছেন এমন অভিযোগ এনে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রকাশ্যে অধ্যক্ষের পক্ষ নেন কাউন্সিলর মাকসুদ। তিনি নুসরাত ও তার পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার চাপ ও হুমকি দিতে থাকেন। এরপর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পক্ষে একটি মানববন্ধনের আয়োজনও করেন মাকসুদ- এমন অভিযোগও রয়েছে নুসরাতের পরিবারের।

এমনকি মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিচার চেয়ে ওই মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদের সাবেক সদস্য ও বর্তমান কাউন্সিলর শেখ মামুনের নেতৃত্বে একটি মানববন্ধন করা হলে মাকসুদ তাকেও মারধর করেন।

গত ৬ এপ্রিল নুসরাতের গায়ে দুর্বৃত্তরা কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর এই কাউন্সিলরের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, নুসরাত যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউয়ে ছটফট করছে তখনও পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে ‘ঘটনাটি সাজানো, ‘মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে’ ইত্যাদি বলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে কাউন্সিলর মাকসুদ। পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় তার চাপে এ ঘটনায় প্রশাসনিক উদ্যোগ ছিল ধীর গতির এমন অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাংবাদিক। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নুসরাতকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়াসহ প্রয়োজনে সিঙ্গাপুরে পাঠাতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের নির্দেশ দেওয়ার পরেও ঘটনার মোড় ঘোরাতে স্থানীয় পুলিশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালায় মাকসুদ।

সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন তার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এমন অভিযোগও করেছেন সরকারি দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন নেতা। এর ফলে মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের তিন তলার ছাদের যেখানে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় সে জায়গাটির আলামত সংরক্ষণেরও চেষ্টা করেনি পুলিশ। ফলে রাতের বৃষ্টিতে জায়গাটি ধুয়ে মুছে গেছে। এসব কারণসহ মামলাটির ব্যাপারে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় পরে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহারও করা হয় ওসি মোয়াজ্জেমকে।

এছাড়া স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ‘নুসরাত আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন’ এমন সংবাদ পাঠাতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলর মাকসুদের বিরুদ্ধে।

পরে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ হতে থাকলে এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলে সাজানো ছক উল্টে যায়। নুসরাত হত্যা মামলায় মাকসুদকে চার নম্বর আসামি করা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

প্রসঙ্গত, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে এর আগেও ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর গত ৮ এপ্রিল তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নম্বর ১০)। এ মামলায় পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার ঘনিষ্ঠজন জাবেদ, শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূর উদ্দিনসহ ১৩ জন গ্রেফতার হয়েছেন।

/টিটি/

লাইভ

টপ