নেত্রকোনায় হাওরে বোরো ধানে চিটা, দিশেহারা কৃষক

Send
হানিফ উল্লাহ আকাশ, নেত্রকোনা
প্রকাশিত : ১১:৪৮, এপ্রিল ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪৮, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এ বছর বোরো (ব্রি ধান-২৮ জাতের) ধানে চিটা হওয়ায় ফসলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যে কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা। সারা বছরের একমাত্র এই ফসলের খরচ ওঠা তো দূরের কথা, ব্যাংক ও মহাজনি ঋণ পরিশোধ নিয়ে এখন চিন্তিত হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা জেলার পাঁচটি হাওর উপজেলাসহ ১০টি উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করা হয় ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৫২ হেক্টর জমি। শেষ পর্যন্ত আবাদ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি। এরমধ্যে ২৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান, ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল এবং ৩২০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। চাল হিসেবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ লাখ ২৫ হাজার ৮২১ টন।
হাওরাঞ্চলে বছরের ৭-৮ মাস পানি থাকায় চাষিদের একমাত্র ফসল হচ্ছে বোরো ধান। প্রতি বছর চৈত্রের শেষ দিকে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু হয়। এ অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর বৈরী আবহাওয়া এবং আগাম বন্যার ঝুঁকিতে থাকেন। পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে প্রায় প্রতি বছর আগাম বন্যায় তলিয়ে যায় কৃষকের সোনালী ফসল।
এ বছর পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যা দেখা না দিলেও ধানে ব্যাপক চিটা দেখা দেওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপুতা হাওর, শনির হাওর, তেতুলিয়া, গাগলাজুর, সুয়াইর, বরান্তর, হাটনাইয়া, আদর্শনগর, খালিয়াজুরী উপজেলার চাকুয়া, জগন্নাথপুর, পাংগাসিয়া, কির্তনখোলা, কটিচাপরা, সেনের বিল, জালর বন, সোনাতোলা, বল্লীর চৌতরা, জগন্নাথপুরের বড় হাওর, বাজোয়াইল, পাঁচহাট, নগর, বোয়ালী, মদন উপজেলার মাঘান, গোবিন্দশ্রী, কদমশ্রী, গনেশের হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে ধানে ব্যাপক চিটা দেখা দিয়েছে।
খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের কৃষক হারুন অর রশিদ জানান, তিনি ৩০ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। এরমধ্যে ২৩ একর জমিতে ধানে চিটা দেখা দিয়েছে।
বল্লী গ্রামের কৃষক বাবুল মিয়া জানান, তার ১৫ একর জমির মধ্যে ১৩ একর জমিতেই চিটা ধান হয়েছে।
হাটনাইয়া গ্রামের কৃষক মজিদ মিয়া জানান, তিনি মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ধারদেনা করে ১০ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। তার সব জমিতেই চিটা দেখা দেওয়ায় কীভাবে তিনি ধারদেনা পরিশোধ করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।
মদন উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার গোলাম রসুল বলেন, ‘এটা বীজের কোনও সমস্যা নয়। এটা শীতজনিত সমস্যা। শীতের কারণে ক্ষেতে ধানের শীষে কালো রঙ দেখা দিয়েছে।’
নেত্রকোনা জেলা কৃষক সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আনিসুর রহমান বলেন, ‘হাওরে বোরো ধানে চিটা হওয়াতে কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। তারা যতটুকু ধান উঠাতে পারছেন, তার যেন ন্যায্যমূল্য পায় সেদিকে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে। এনজিওগুলো এবং মহাজনরা যাতে কৃষকের ওপর সুদের জন্য নির্যাতন চালাতে না পারে সেই দিকেও স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বিশেষ খেলায় রাখাতে হবে।
এদিকে গাজীপুর কৃষি গবেষণা ইনিস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহম্মদ আশিক, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হীরেন্দ্র নাথ বর্মন, উদ্ভিদ রোগতত্ব বিভাগের অফিসার ড. তুহিনা খাতুন নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী এবং মদন উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকার আক্রান্ত বোরো জমি পরিদর্শন এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ব্যাপারে তারা কৃষকদের কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
কর্মকর্তারা অভিমত দেন যে, ২৯ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত রাতে তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এবং দিনে ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকায় বীজ তলা তৈরি ও চারা রোপণের সময় কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। ফলে ধানে ব্যাপক আকারে চিটা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন এবং কলমাকান্দা উপজেলার হাওরাঞ্চলের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।’

/এআর/

লাইভ

টপ