‘এক শ্রমিকের মুজুরি দেড়মণ ধানের দাম, ক্ষেত গিরস্থি কইরা কিতা অইব’

Send
হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৭:৫৪, এপ্রিল ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৭, এপ্রিল ২০, ২০১৯

‘একজন ধানকাটা-শ্রমিকের মুজুরি দিতে দেড় মণ ধানের দাম লাগে, ক্ষেত গিরস্থি কইরা কিতা অইবো। জমি লাগানোর সময় দিছি পাঁচশ’ টাকা, রোজ ধান কাটার লাইগ্গা দেওন লাগে ছয়শ’। কামলারোজ সাতশ’ টাকা। এতো মুজুরি দিয়া ধান কাইটা কী আর থাকবো!’ শ্রমিক সংকট ও অতিরিক্ত মজুরির ব্যাপারে এভাবেই বলছিলেন সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সাদকপুর গ্রামের কৃষক সোনা মিয়া।
জানা গেছে, হাওরজুড়ে জমিতে পাকা ধান থাকলেও শ্রমিক সংকটের কারণে তা কেটে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকরা। প্রতিবছর হাওরে ফসল কাটার সময় এলে ধান কাটার শ্রমিকের সংকট হয়। এদিকে শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় অনেকে নিজ সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে ধান কাটার জন্য জমিতে নিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষকদের দাবি, এতো টাকা খরচ করে ধান কাটানোর সক্ষমতা সবার নেই। আর এভাবে ধান কাটলেও মূল খরচই ওঠে না। আর ধান না কাটলে হাওরের জমিতেই পড়ে থাকবে ধান। আর দেরি করার কারণে তীব্র বাতাসের দোলায় ছড়া থেকে জমিতে ঝরে যাচ্ছে ধান। ফলে উৎপাদন অনেক কমে যায়।
সাদকপুর গ্রামের কৃষক বিন্দু বিহারী দাস বলেন, ‘কামলা রাখতে হলে তিনবেলা খাওয়ানো, গুয়া-পান, আসা-যাওয়ার খরচ, বিকালের চায়ের খরচসহ ছয়শ’ থেকে সাতশ’ টাকা মুজুরি দেওন লাগে। এমনে গিরস্থি কইরা কিতা অইবো। ধানের দাম চারশ’ থাকি পাঁচশ’ টাকা মণ আর কামলারোজ ছয়শ’ থেকে সাতশ’। কোনোভাবেই ক্ষেত গিরস্থির হিসেব মিলানো যায় না।’
একই গ্রামের কৃষাণী রাধা রাণী দাস বলেন, ‘কামলার রোজ বেশি, তাই বাড়ির পোলাপানদের ইস্কুল বাদ দিয়া ধান কাটনো লইয়া আইছি। কামলা অত দও দিলে ক্ষেতের ধান আর বাড়িত নেওন যাইতো না, হাওরেই সব দেওন লাগবো।’
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সব হাওরে একসঙ্গে ধান কাটা শুরু হয়েছে। হাওরে যে পরিমাণ পাকা ধানের জমি রয়েছে, সেই পরিমাণ শ্রমিক নেই। তাই পাকা জমিতে ধান গড়াগড়ি খাচ্ছে। এতে ঝড়-বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার হুমকি রয়েছে। ১০ মিনিট শিলাবৃষ্টি হলেও জমির পাকা ধান জমিতে ঝরে পড়বে। এছাড়া ঝড়ো বাতাসে ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

আব্দুল্লাহপুর গ্রামের হরমুজ আলী বলেন, ‘শ্রমিক সংকটের কারণে দুইগুণ তিনগুণ মজুরি দিয়ে কামলা রাখতে হচ্ছে।’
মতিন্দ্র দাস বলেন, ‘ধান কাটার মেশিন বাইর হইছে হুনছি, কিন্তু দেখি নাই। সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে কৃষকের জন্য ধান কাটার মেশিনর ব্যবস্থা করতো, তাহলে এতো বিপদে পড়তো না কৃষক।’
ইছাগরি গ্রামের আব্দুল খালেক বলেন, ‘একজন কামলা সারা দিনে ১৫ শতাংশ জমিনের ধান কাটতে পারে। আর ১৫ শতাংশ জমিতে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ মণ ধান হয়। কামলার মজুরি দিতে দেড় মণ ধান বিক্রি করতে হয়। তারপরও ধান মাড়াই দিতে আরও টাকা লাগে। এভাবে কৃষকের হাতে লাভ বলতে কোনও কিছু থাকে না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর উপপরিচালক বশির আহম্মেদ সরকার বলেন, ‘শ্রমিক সংকটের কারণে পুরো জেলায় ধীর গতিতে ধান কাটা হচ্ছে। এছাড়া জমিতে পাকা ধান থাকলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে জমির ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শ্রমিক সংকট নিরসন ও হাওরের পাকা ধান কাটার জন্য কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও কোথাও কোথাও ধান কাটার মেশিন দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে মেশিনের সুবিধা পাচ্ছেন খুব কম সংখ্যক কৃষক। মূলত হাওরের বেশিভাগ ধান ম্যানুয়ালি কাটা হয়। এতে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন। কিন্তু জেলায় এতো শ্রমিকের জোগান নেই। তাই মজুরি বেশি দিতে হচ্ছে। এতে কৃষক লোকসানের মুখে পড়েছেন।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, ‘সুনামগঞ্জ জেলা মাছ ও ধান উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। কৃষক যাতে নির্বিঘ্নে ধান ঘরে তুলতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। সারা দেশে এখন ধান কাটা শুরু হয়েছে তাই হাওরে শ্রমিকের স্বল্পতা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে পাথর ও বালি-মহালে অনেক শ্রমিক কাজ করে। সেখানকার মজুরি ধান কাটার মজুরি থেকে বেশি। সেজন্য শ্রমিকরা এসব স্থানে কাজ করতে আগ্রহী।’
জেলায় সাড়ে তিন লাখ কৃষক এবছর বোরো ধান আবাদ করেছেন। এখানও ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে বলেও জানা গেছে।

/এএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ