জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

Send
সুমন সিকদার, বরগুনা
প্রকাশিত : ১৩:২৬, এপ্রিল ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৪, এপ্রিল ২০, ২০১৯

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানবরগুনার পৌর শহরে অবস্থিত চরকলোনী হামিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটিকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করেছে সদর উপজেলা শিক্ষা অফিস। তবুও জরাজীর্ণ এই বিদ্যালয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষকরা। যেকোনো সময় বিদ্যালয়ের ভবন ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারনা করছেন প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা। ভবন ধসের আতঙ্ক নিয়েই ক্লাস করছেন শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে,১৯৭০ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় এমএ হামিদ মিয়া। এরপর ১৯৭৩ সালে বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) ১৯৮৯ সালে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক আছেন ১৪ জন এবং শিক্ষার্থী আছেন ৩৫১ জন।  

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়টির অবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে। ভবনের ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে রড বের হয়ে গেছে। বিভিন্ন কক্ষের ভেতরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুয়ে পানি পরার কারণে দেওয়ালগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। রাস্তা দিয়ে কোনও ভারি যানবাহন গেলে ভবনটি কাপতে থাকে। এমন অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে এই বিদ্যালয় পাঠদান করানো হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মারজুক বলেন, ‘সামনে আমাদের পরীক্ষা। তাই বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আমরা একরকম বাধ্য হয়ে ক্লাস করছি। এখন সবসময় স্কুল  ধসে পরার আতঙ্কে থাকি। তাই পাঠদানের সময় ক্লাসের পড়ায় ভালোভাবে মনোযোগী হতে পারি না।’

এই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী অভিভাবক রহিমা বেগম বলেন, ‘বর্ষাকালে ক্লাসের মধ্য পানি পরে। মাঝেমাঝে ভবন কাঁপতে থাকে। তাই ঝুঁকির কথা চিন্তা করে কাজ ফেলে স্কুলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। সন্তানকে নজরে রাখি। এভাবে কি লেখাপড়া করানো যায়?’

আরেক অভিভাবক মোসাম্মৎ আঁখি বলেন, ‘স্কুলের পলেস্তারা খুলে খুলে পড়ছে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা হতে পারে। তাই সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যেই থাকি।’

চলতি বছরের মার্চ মাসের ১৩ তারিখ জেলা পর্যায়ে আন্ত:প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে বিদ্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শেফা  অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান। এসময় প্রধানমন্ত্রী এখানে নতুন ভবন দেওয়ার আশ্বাস দেন। শেফা বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার নেওয়ার সময় তাকে আমাদের বিদ্যালয়ের কথা বলি। এসময় তিনি আমাকে এখানে নতুন ভবন দেওয়ার কথা বলেন।’

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম কবীর বলেন, ‘বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আমি অথবা আমার বিভাগ এটা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করতে পারে না। তাই আমরা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিদ্যালয় ভবনটিতে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেছি।’

বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সদর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমরা মৌখিকভাবে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করেছি।’

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসনা হেনা বলেন,  ‘বিদ্যারয়টি  পরিত্যক্ত  ঘোষণা করা হয়েছে বলে আমাদেরকে জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনও লিখিত চিঠি পাইনি।’ এসময় তিনি আরও বলেন, ‘এই বিদ্যালয়টিতে পাঠদান বন্ধ করতে বলা হলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিকল্প কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’

বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মৌখিকভাবে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে এটাকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হবে।’

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিকল্প কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে আপাতত বিদ্যালয়ের পাশে একটি একতলা ভবনে অফিস কক্ষটি স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, চলতি মাসে ৬ এপ্রিল তালতলী উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একতলা ভবনের বিম ধসে পড়ে এক শিক্ষার্থী নিহত এবং ৫ জন আহত হয়। এছাড়া ১০ এপ্রিল  রগুনা  সদর উপজেলা ১৬ নম্বর মধ্য বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস চলাকালিন সময় ছাদের  পলেস্তারা খসে পড়ে এবং ১২ এপ্রিল আমতলী উপজেলার দক্ষিণ তক্তাবুনিয়া জগৎচাঁদ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের ছাদের বিম পলেস্তারা খসে পড়ে। 

/এসএসএ/

লাইভ

টপ