১৫ মাসের কাজ ৩ মাসে, ৯ কোটি টাকা গচ্চা!

Send
সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ, পঞ্চগড়
প্রকাশিত : ০৭:৫৯, এপ্রিল ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪১, এপ্রিল ২১, ২০১৯



স্থানীয়দের দাবি খননের আগে নদীতে গলা পানির মতো থাকতো, তবে এখন নাকি থাকে হাঁটু পানিপঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীর পাঁচ কিলোমিটার এলাকার চর অপসারণসহ খননের কাজ শুরু হয় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। বারুণী মন্দির থেকে কালিয়াগঞ্জ বাজার এলাকা পর্যন্ত খনন কাজের মাধ্যমে নদীতে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নাব্য বাড়ানো, সেচ সুবিধার মাধ্যমে কৃষি ও মৎস্য সম্পদ বাড়ানো এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

কিন্তু নকশা ও নিয়ম না মেনে ১৫ মাসের কাজ শেষ করা হয় মাত্র ৩ মাসে। ফলে বছর না ঘুরতেই নদী আবারও ভরাট হয়ে গেছে। এতে উপকারের পরিবর্তে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এলাকাবাসী। তারা মনে করছেন, এই প্রকল্পে সরকারের বরাদ্দ বিপুল অর্থের বেশির ভাগই জলে গেছে।

নদী খননে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছেস্থানীয়রা জানান, খননের আগে যেখানে বুক থেকে গলা পর্যন্ত পানি ছিল, খননের পর সেখানে হাঁটুজল প্রবাহিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বারুণী মন্দির থেকে কালিয়াগঞ্জ বাজার পর্যন্ত খনন কাজ শুরু করে পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ড। দরপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৩১ মে প্রকল্পটি শেষ করার কথা। কিন্তু তড়িঘড়ি করে ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল খনন কাজ শেষ করা হয়। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর নারায়ণগঞ্জ সোনাকান্দা বন্দরের ‘ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই কাজটির দায়িত্বে ছিল।

ঠিকমতো নদী খনন না হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয়রা স্থানীয় সূত্রে জানা যায়; ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য, ৬০ মিটার প্রস্থ ও ৩ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে তোলা বালু ২০০ মিটার দূরে অপসারণের কথা ছিল। কিন্তু যেনতেনভাবে খনন করে নদীর ওপরই বালি ফেলা হয়। ফলে গত বর্ষায় আবারও বালি গড়িয়ে নদী ভরাট হয়ে যায়। চর অপসারণ ও খনন করে কোনও কাজেই আসেনি, বরং খননের পর নদীর পানি, মাছ ও ফসল উৎপাদন কমেছে।

জেলার ফুলতলা, বেংহারী, দীঘলগ্রাম, আমতলা, ঘাগড়া, সর্দ্দারপাড়া, মাঝাপাড়া, প্রধানপাড়া, কাউয়াখালী, নাজিরগঞ্জ, দইখাতা, নাসের মণ্ডলহাটসহ ২০টি গ্রামের মানুষ নানাভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। এই নদীর পানি ব্যবহার করেই তারা ধান, পেঁয়াজ, গমসহ বিভিন্ন শস্য উৎপাদন করেন। তাই নদী খননের পর ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এলাকাবাসী।

সঠিকভাবে খনন না হওয়ায় নদীর নাব্যতা সংকট রয়ে গেছে বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের কাওয়াখালী এলাকার মৎস্যজীবী জহিরুল ইসলাম (৬৫) ও নাজিরগঞ্জ এলাকার মৎস্যজীবী মহিরউদ্দিন (৫০) জানান, নদী খননের আগে মাছ ধরে সংসার চলতো। এখন বালু পড়ে নদী ভরাট হয়ে গেছে। পানি কমে গেছে। নদীতে এখন মাছ পাওয়া যায় না। সারাদিন বসে থেকেও সংসার চালানোর মতো মাছ ধরতে পারছি না। আগে শত শত মৎস্যজীবী নদীর পাড়ে বসে মাছ ধরতো। এখন দু’চারজনের বেশি থাকে না।

নাজিরগঞ্জ এলাকার আরফান আলী (৭০) বলেন, ‘আগে আমি নদীতে বোরো ধান, পেঁয়াজ ও গম আবাদ করতাম। এখন কোনোটাই করতে পারছি না।’

নাসের মণ্ডলহাট এলাকার মৎস্যজীবী ওসমান গনি (৫৫) বলেন, ‘পলি মাটি কেটে ফেলায় নদী এখন বালুতে ভরে গেছে। ফলে এখন আর তেমন ফসল হচ্ছে না। আবার সারাদিন বসে থেকেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।’

দইখাতা নাজিরগঞ্জ ছিটমহলের (বিলুপ্ত ) তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. আব্দুল খালেকের অভিযোগ, ‘কাজটা যেভাবে হওয়ার কথা, সেভাবে হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে বরাদ্দের সিংহভাগ টাকাই লুটপাট হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। বিষয়টি তদন্ত করে পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

নদী পরিণত হয়েছে ছোট খালে পানি উন্নয়ন বোর্ড পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘করতোয়া নদীর যে পাঁচ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে, ওই এলাকায় বর্তমানে সুন্দরভাবে পানি প্রবাহিত হচ্ছে, মাছ বেড়েছে, কিছু জমি নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে; যেটা পরবর্তীতে কাজে লাগানো সম্ভব। এছাড়াও অনেক বেদখল জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। নদীর প্রবাহ ও পানিধারণ ক্ষমতা বেড়েছে, যে পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করে অনেক সুফল পাবে কৃষকরা।’ খননের পর ঠিকাদারকে ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।


/আইএ/এএইচ/টিটি/

লাইভ

টপ