কলসিন্দুর স্কুলে আগুন দিলো কারা জানে না কেউ!

Send
আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত : ১৯:৩০, মে ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০৬, মে ১৫, ২০১৯

কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে অগ্নিসংযোগপ্রায় দুই দিনেও রহস্যের জট খোলেনি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার ফুটবল কন্যাদের কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অফিস কক্ষে অগ্নিসংযোগের ঘটনার। কোনও কূলকিনারা না হওয়ায় হতাশ শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসী। নির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করতে পারছেন না তাদের কেউই। ধোবাউড়া থানার ওসি আলী আহম্মেদ মোল্লা জানান, ঘটনার পর থেকেই তদন্ত চলছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গভর্নিং বডিসহ এলাকাবাসীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। অগ্নিসংযোগের সঙ্গে কারা জড়িত এ বিষয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে।

তবে দ্রুতই তদন্তের মাধ্যমে রহস্য উন্মোচিত এবং দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান ওসি আলী আহম্মদ মোল্লা।

কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক মালা সরকার জানান, এই স্কুলের মেয়েরা শুধু দেশেই না, বিদেশেও ফুটবলে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ফুটবল কন্যাদের সুনামের জন্যই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্কুল অ্যান্ড কলেজটি সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এর কার্যক্রম চলছে। তৃতীয় কোনও পক্ষ এই স্কুলের সুনাম এবং উন্নতি সহ্য করতে না পেরে জিদের বশবর্তী হয়ে অফিস কক্ষে অগ্নিসংযোগ করেছে। এ ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হওয়াটা খুবই জরুরি।

কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজওই স্কুলের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলে স্কুলের কারিগরি শাখার এসএসসি ভোকেশনাল বিভাগে বেশ কিছু প্রবেশপত্র না আসায় কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। এর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কারিগরি শাখার টেকনিশিয়ান সোহাগ মিয়াকে ওই সময়ে গভর্নিং বডি সাময়িক বরখাস্ত করে। বর্তমানে বিষয়টির তদন্ত চলছে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে এই অগ্নিসংযোগের ঘটনার কোনও সম্পর্ক আছে কিনা এ নিয়ে আলোচনা করছে।

তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে টেকনিশিয়ান সোহাগ মিয়া জানান, এই স্কুলের চাকরির বেতনে আমার সংসার চলছে। যেখান থেকে রিজিকের ব্যবস্থা হচ্ছে সেই স্কুলে আমি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাতে পারি না। একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার প্রধান শিক্ষক রতন মিয়া জানান, স্কুলের জমিজমা, গভর্নিং বডি কিংবা অন্য কোনও বিষয় নিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে সমস্যা নেই। স্কুলটি এখন সরকারিকরণের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দফতর থেকে অডিটসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। রমজান উপলক্ষে বন্ধ থাকায় শিক্ষকরাও ছুটিতে আছেন। এভাবে ভোরবেলা দুর্বৃত্তরা অফিস কক্ষে ঢুকে অগ্নিসংযোগ করবে এটা কেউ মেনে নিতে পারছেন না। তিনি আরও জানান, ওই অফিস কক্ষে শিক্ষকরাও বসেন। তাদের কাগজপত্র সংরক্ষণের জন্য জন্য কেবিনেট ফাইলে ১২টি ড্রয়ার আছে। দুর্বৃত্তরা ১২টি ড্রয়ারের মধ্যে ৫টি ড্রয়ারের তালা ভেঙে কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে। এরমধ্যে সহকারী শিক্ষক উজ্জ্বল পাল ও আব্দুল মালেকের মূল সনদপত্রগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন তিনি।

সহকারী শিক্ষক উজ্জ্বল পাল বলেন, এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স এবং মাস্টার্সের মূল সনদপত্র ও নম্বরপত্র ড্রয়ার থেকে বের করে পুড়িয়ে দিয়েছে। তিনি জানান, স্কুলটি সরকারিকরণের বিষয়ে ঘন ঘন অডিট কাজ চলায় মূল সনদ ও নম্বরপত্র বাসায় না রেখে ড্রয়ারে রেখেছিলাম। এর সঙ্গে সহকারী শিক্ষক আব্দুল মালেকের মূল সনদ ও নম্বরপত্রগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তবে এই কাজটি কে করেছে এ বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেননি তিনি।

কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজএ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার শিমু জানায়, স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীর মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কে বা কারা এবং কী কারণে এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে এটা কেউ মেনে নিতে পারছেন না। শিমু আরও বলে, দুই জন শিক্ষকের সার্টিফিকেটের মূল কাগজপত্র পুড়িয়ে দিয়ে দুর্বৃত্তরা জঘন্য কাজ করেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে শিমু।

একই স্কুলের শিক্ষার্থী অমিত শাহ জানায়, স্কুলের অফিস কক্ষে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এলাকায় নিন্দার ঝড় উঠেছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের নাম-পরিচয় শিক্ষার্থীরা জানতে চায়।

কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির অভিভাবক সদস্য রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সুনামের সঙ্গে এবং সুষ্ঠুভাবেই স্কুলটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। রমজানের বন্ধের সুযোগে দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। স্কুলটি সরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে দুর্বৃত্তরা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ১৪ মে মঙ্গলবার ভোরে দুর্বৃত্তরা ধোবাউড়ার কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার অফিস কক্ষে ঢুকে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসহ স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের খেলার সনদপত্র, মেডেল ও ক্রেস্ট পুড়ে যায়। এর সঙ্গে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ফাইলও পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই স্কুলের শিক্ষার্থী মারিয়া মান্দা, তহুরা, সানজিদাসহ বেশ কয়েকজন জাতীয় নারী ফুটবলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এদের সুনামের কারণেই এখন সারাদেশের মানুষের কাছে কলসিন্দুর স্কুলের নামটি পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নারী ফুটবলারদের অনুপ্রাণিত করতে এই স্কুলটি সরকারিকরণের ঘোষণা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন- কলসিন্দুর স্কুলে ফুটবল কন্যাদের মেডেল-সার্টিফিকেট পুড়িয়ে দিলো দুর্বৃত্তরা

/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ