খরায় বেড়েছে ধান চাষের খরচ, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানে কৃষকরা

Send
হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৮:০৭, মে ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:১৫, মে ১৯, ২০১৯





 তীব্র খরায় এবার বোরো ধানচাষের জন্য ক্ষেতে বেশি পানি দিতে হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে হাওরের কৃষকদের। এছাড়া বীজধান কেনা, বীজতলা তৈরি, জমিচাষ, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ধান কাটা, পরিবহণ ও শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন ধরনে ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণও করতে হয়েছে। তবে, ধান যখন ঘরে ওঠার সময় হয়েছে, তখনই পাওনাদারদের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না সুনামগঞ্জের কৃষকরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের দাবি—সরকারিভাবে সময়মতো ধান কিনলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।



কথা হয় সুনামগঞ্জ সদরের লক্ষ্মণশ্রী ইউনিয়নের জানীগাঁও গ্রামের কৃষক রমজান আলী, শাহজাহান মিয়া, মঈনুল ইসলাম, দিলভী বেগমের সঙ্গে। ধানের দাম কম হওয়ায় বিপাকে পড়া এসব কৃষক জানান, এবার খরা বেশি হওয়ায় সেচখরচ বেড়েছে। জমির পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় হালচাষ ও ধান রোপণসহ চাষাবাদ সংক্রান্ত সব কাজই দ্রুত করতে হয়েছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘১৫০ শতক জমিতে বোরো আবাদে খরচ হয়েছে ২৪ হাজার টাকা। ধান পেয়েছি ৪০ মণ। যার স্থানীয় বাজার দর ২৪ হাজার টাকা ও সরকার নির্ধারিত মূল্য ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। সরকার সময়মতো ধান না কেনায় ১৭ হাজার ৬০০ টাকা লোকসানে স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া চাষের সময়ের ঋণ পরিশোধের জন্য কম দামে এখনই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’
কৃষক সালমা আক্তার বলেন, ‘জমি পরিষ্কার ও চারা রোপণ করতে প্রতিদিন একবেলা খাবার ও তিনশ’ টাকা নগদ গুনে দিতে হয়েছে। হাওরে একযোগে বোরো আবাদ শুরু হওয়ায়, শ্রমিক সংকট ছিল। তাই বেশি দামে কৃষি শ্রমিক দিয়ে জমি রোপণ করতে হয়েছে। এছাড়া আগাছা পরিষ্কারের জন্যও একই দামে শ্রমিক নিতে হয়েছে। আগেরবার মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ায় সেচ কম লেগেছে। এবার জমিতে ঘনঘন সেচ দিতে হয়েছে। ফলে ধানের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু এখন দাম পাচ্ছি না।’
চলছে ধান মাড়াইয়ের কাজ
কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, ‘হাওর এলাকার লাখ লাখ কৃষক ধান রোপণের সময় কৃষি বিভাগের পরামর্শ থেকে বঞ্চিত। কারণ কৃষি বিভাগের এত জনবল নেই যে, রোপণ থেকে কাটাপর্যন্ত কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবে। তাই আমরা নিজেদের মতো করে জমিতে সার, কীটনাশক, সেচ দিয়েছি। এ জন্য এ সব উপকরণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লেগেছে। এ কারণে ধান উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে।’
সদর উপজেলা মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের ফয়েজ মিয়া, জাকির হোসেন, তাজুল ইসলাম, আবু বক্কর অনেকের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, কার্তিক মাসে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ধান চাষ করেছি। জৈষ্ঠ্য মাসে ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করার কথা। এখন মাসের প্রথম সপ্তাহ চলছে। মহাজনদের ঋণ পরিশোধ না করলে, আগামীতে কৃষি কাজের সময় ঋণ পাওয়া যাবে না। তাই কম দামে ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছি। তবে বড় কৃষকরা ঠিকই ধান মজুদ করছেন, দাম বাড়লে তারা বিক্রি করবেন। মার খাচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
কৃষক ফয়েজ মিয়া বলেন, ‘ঘরে ধান ছাড়া তো আর কিছুই নেই। চাল, ডাল, তেল, হলুদ, মরিচ, লবণ কেরোসিনসহ সবই কিনতে হয়। আগেই দোকনগুলোতে অনেক বাকি হয়ে গেছে। হাতে নগদ টাকা না নেই, তাই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা যে দর পাচ্ছি, তাতেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’
জেলা সদরের শ্রীনাথপুর গ্রামের কৃষক রিপন মিয়া বলেন, ‘মাছ, গরু, সবজি সবকিছুর বাজার আছে, কিন্তু ধানের নির্দিষ্ট কোনও বাজার নেই। যেখানে কৃষক যাচাই-বাছাই ও দরদাম করে ধান বিক্রি করতে পারেন। ধান বিক্রির জন্য পূর্ব-পরিচিত কোনও ফড়িয়াতে খবর দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসতে হয়। ফলে দরদামের জায়গা থাকে না বলে দাম কম পাই আমরা।’
‘সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও’ আন্দোলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, ‘হাওর এলাকার প্রান্তিক কৃষক ইচ্ছে করলেও নির্দিষ্ট সময়ের পর ঘরে ধানের মজুদ রাখতে পারেন না। তাদের বেশির ভাগ ঋণ করে জমিতে ফসল ফলান। সেই ঋণ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। তাই এ সময় প্রান্তিক কৃষক অনেকটা একযোগে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। এ জন্য তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যেন তারা কৃষিকাজের পাশাপাশি বিকল্প কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।’
ধান মাড়াইয়ে ব্যস্ত কৃষকরাতাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘হাওরের কৃষকদের জন্য নতুন করে ভাবতে হবে। তাদের জন্য কৃষি ঋণ, জমি চাষের পরামর্শ, কৃষি উপকরণসহ সব সেবা একটি জায়গা থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। পৃথকভাবে সেবা দেওয়ার ফলে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও উৎপাদন খরচ বাড়ে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এই বোরো মওসুমে জেলার হাওর এলাকায় ১ লাখ ৭২ হাজার ২২৭ হেক্টর ও হাওরের বাইরে ৫২ হাজার ২১৩ হেক্টরসহ মোট ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন তিন লাখ কৃষক।
অধিদফতর সূত্র আরও জানায়, এবার সুনামগঞ্জে প্রতিমণ ধানের উৎপাদন খরচ হয়েছে ৬২০ টাকা। এ বছর ২৫ এপ্রিল থেকে ধান সংগ্রহের সরকারি নিদের্শনা দেওয়া হলেও প্রকৃত কৃষকদের তালিকা তৈরির বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার কারণে মে’র মধ্যভাগ থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়। চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে ১৬ মে থেকে। জেলার আট হাজার কৃষক ৪০০ কেজি থেকে একটন ধান সরকারি মূল্যে খাদ্য গুদামে বিক্রি করতে পারবেন। জেলার ১১টি উপজেলায় ১২টি এলএসডিতে একযোগে ধান ক্রয় করা হবে।

/আইএ/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ