কাবিখা’র টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসি’র নামে নামকরণ!

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ১৭:৪৬, মে ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৫, মে ১৯, ২০১৯

সুলতানা পারভীন (ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

কুড়িগ্রাম শহরে সরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ের অনুদানে পুকুর সংস্কার করে জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীনের নাম অনুসারে ‘সুলতানা সরোবর’ রাখা হয়েছে। এ নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বইছে সমালোচনার ঝড়। জেলার সচেতন মহলের প্রশ্ন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে পুকুর সংস্কার করে জেলা প্রশাসকের নাম কেন দেওয়া হবে?

কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) প্রকল্প থেকে এই পুকুর সংস্কারের জন্য চাল ও সোলার স্ট্রিট লাইট বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খন্দকার মো. মিজানুর রহমান।

কুড়িগ্রাম শহরের ‘নিউ টাউন পার্ক’ নামে পরিচিত এই পুকুরটি ৪০ বছরের পুরনো।

জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে কুড়িগ্রাম শহরে এই পুকুর খনন করা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘নিউ টাউন পার্ক’। পুকুরটিতে মাছ চাষ করা হতো। পাশাপাশি এর পাড়ে গড়ে ওঠে নার্সারি। তবে বিভিন্ন সময় পুকুর পাড়ে অসামাজিক কার্যকলাপ চলার অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক জেলা প্রশাসকের পরিকল্পনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন পুকুরটি সংস্কার করে এর পাড়ে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেয়। বর্তমান জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন পুকুরটির সংস্কার কাজ শুরু করেন।

সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে পুকুরটি পুনঃখনন করে চারপাশে ওয়াকওয়ে তৈরি করে স্থাপন করা হয় সোলার স্ট্রিট ল্যাম্প। পুকুর সংস্কারের বিষয়টি সব মহলে প্রশংসিত হলেও বিপত্তি ঘটে এর নাম পরিবর্তনের খবরে।
গত ১৪ মে জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তার ছবিসহ পুকুরের নতুন নাম (সুলতানা সরোবর) সংবলিত একটি পোস্ট দেন। এরপর জেলাজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা।
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দশম সংসদের কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তাজুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার অনুকূলে টিআর কাবিখা’র বরাদ্দ অর্থ থেকে পুকুরটি সংস্কার কাজ করা হয়। এতে প্রায় ১০৪ দশমিক ৫৫৫ মেট্রিক টন চাল এবং ২৫টি সোলার স্ট্রিট ল্যাম্প বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া অন্য স্থান থেকে ৩১টি সোলার স্ট্রিট ল্যাম্পের বরাদ্দ কেটে এই পুকুর পাড়ে স্থাপন করা হয়। এছাড়াও জেলার কিছু ব্যক্তি অনুদানও দেন।

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদ দুলাল বোস বলেন, ‘রাষ্ট্রের টাকায় কোনও সংস্কার কাজ করে জেলা প্রশাসক নিজের নামে নামকরণ করতে পারেন না। তিনি সরকারি দায়িত্ব পালন করতে জেলায় এসেছেন।’

রেল, নৌ-যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি নাহিদ হাসান বলেন, ‘এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না। জনগণের টাকায় পুকুর সংস্কার হওয়ায় জেলার কোনও কৃতী সন্তানের নামেই এটির নামকরণ করা উচিত।’

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে। তারা অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

মো. মাইদুল ইসলাম মাহিন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘জনগণের টাকায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নিজের নামে পুকুরের নাম দিয়েছেন, অথচ ডিসি কোয়ার্টারের পেছনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী কছিম উদ্দীনের জমি অধিগ্রহণ করে তাকে ভূমিহীন করা হয়েছে। পুকুরটি কছিম উদ্দীনের নামে বা সৈয়দ শামসুল হকের নামে কিংবা তারামন বিবির নামে হতে পারতো। এতে ডিসির সুনাম বাড়তো।’

জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন অস্ট্রেলিয়া সফরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে এ বিষয়ে তার মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনও উত্তর দেননি।

জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “পুকুরটির নামকরণ নিয়ে জেলাজুড়ে সমালোচনার বিষয়টি আমরা জেনেছি। কুড়িগ্রামের কিছু মানুষ ‘সুলতানা সরোবর’ নামকরণের প্রস্তাব করে তারাই আবার সমালোচনা করছেন। তবে ডিসি স্যার দেশের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে এ নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সংস্কারের পর পুকুরের নতুন নামকরণ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।’

কাবিখা’র টাকায় পুকুর সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক বলেন, ‘কিছু মানুষের অনুদানের টাকায় পুকুরটি সংস্কার করা হয়েছে। কাবিখা’র টাকা এতে ব্যয় করা হয়নি।’

/এআর/এইচআই/এমওএফ/

লাইভ

টপ