ধান নিয়ে মৌলভীবাজারের হাওরের কৃষকদের যত দুশ্চিন্তা

Send
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১০:৪৩, মে ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৭, মে ২১, ২০১৯

মৌলভীবাজারে দুশ্চিন্তায় কৃষকরাঅনুকূল আবহাওয়া এবং পোকা-মাকড়ের আক্রমণ না থাকায় মৌলভীবাজার জেলার সাতটি উপজেলায় এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকরা জমি থেকে ধান হাসিমুখে ঘরে তুলেছেন। গত কয়েক বছর আগাম বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষকরা বেরোধান ঠিকমতো উঠাতে না পারলেও এবার সবকিছুই ঠিক ছিল। বিঘাপ্রতি ধানের ফলন ১৬ থেকে ২০ মণ হওয়ায় খুশি কৃষকরা। তবে এখন দুশ্চিন্তা ধানের দাম নিয়ে। লাভের আশা বাদ দিয়ে উৎপাদন খরচ কীভাবে উঠবে সেই চিন্তায় ব্যস্ত তারা।

কুলাউড়ার ভুকশিমইল ইউনিয়নের মুক্তাজিপুর গ্রামের কৃষক কুটি মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। প্রতি বছর কৃষি কাজ করে জীবিকা চালাই। আল্লাহর রহমতে এবার ধানের ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু ধানের মণ ৫০০ টাকা। কাজের মানুষের রোজ ৫০০ টাকা, তারওপর তিন বেলা খাওয়াতে হয়। এই খরচ মেটাতে হয় নিজের পকেট থেকে। ৫০০ টাকা মণ দরে ২৪ মণ বোরো ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেছি। কিছু ধান রেখেছি নিজের খাওয়ার জন্য, তাও পুরো বছর যাবে না। কয়েক বছর ধরেই অপেক্ষায় আছি ধানের দাম যদি বাড়ে তাহলে ধান বিক্রি করে লাভবান হবো। কিন্তু তার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। সন্তানদের লেখাপড়া ঠিকমতো করাতে পারি না। অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে গেলে অনেক টাকাও লাগে। ক্ষেতের ধান বিক্রি করে খরচও উঠে না। এ অবস্থা থাকলে জমিতে আর ধান লাগাতে যাবো না।’মৌলভীবাজারে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

হাকালুকি হাওরের তীরবর্তী ভূকশিমইল ইউনিয়নের মহিষঘরি গ্রামের কৃষক আনফর আলী বলেন, ‘আমরা যারা কৃষক আছি এ নিয়ে সরকার কোনও চিন্তা করে না। সরকারের চিন্তা থাকলে সরকার আমাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ও চাল কিনতো। ধানের ন্যায্য মূল্যও দিতো। আমরা তো হাওর পাড়ের মানুষ, জীবন চালানোর জন্য বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল।’

একই কথা জানালেন মুক্তাজিপুর গ্রামের কৃষক হারিছ মিয়া, ফয়ছল আহমদ ও গৌড়করন গ্রামের লেচু মিয়া।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী বলেন, ‘চলতি বছর বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ৫৩ হাজার ১৬২ হেক্টর জমিতে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন চাল। উৎপাদন ভালো হয়েছে। কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারছেন। কাটার সময় একসঙ্গে অনেক ধান মাঠ থেকে সংগ্রহ করেন কৃষকরা। তাই ধান বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু দিন মজুদ রেখে বিক্রি করলে মূল্য কিছুটা বেশি পাওয়া যাবে।’মৌলভীবাজারে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

তালিমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা হাওরের কৃষক তাহির আলী, মিন্নত মিয়া ও ছাদ উদ্দিন বলেন, জমি পরিষ্কার ও চারা রোপণ করতে প্রতিদিন একবেলা খাবার ও ৫০০ টাকা করে রোজ দিতে হয়েছে। হাকালুকি হাওরে একযোগে বোরো আবাদ শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। তাই বেশি দামে শ্রমিক দিয়ে জমিতে ধান রোপণ করতে হয়েছে। তারা আরও বলেন, আগাছা পরিষ্কার করতে একই দামে শ্রমিক নিতে হয়েছে। এছাড়াও জমিতে সার, কীটনাশক দেওয়ার জন্যই শ্রমিক নিতে হয়েছে। এজন্য ধানের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ধান বিক্রি করতে এখন ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না তারা।

জেলার রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাইক্কাবিল হাইল হাওর এলাকায় শ্রমিক সংকট থাকায় বেশি দামে কৃষক শ্রমিক দিয়ে ধান রোপন ও ধান কাটতে গিয়ে অনেক খরচ হয়েছে। যার ফলে কৃষকরা ধান বিক্রির সময় উৎপাদন খরচ উঠছে না বলে জানিয়েছেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার রুপুসপুর এলাকার বাসিন্দা কৃষক আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘১২০ শতক জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। ধানের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু ধান চাষ করতে সবমিলিয়ে আমার খরচ হয়েছে ২০/২৫ হাজার টাকা। ধান পেয়েছি ৭০ মণ। ধানের মণ ৫০০ টাকা। আমার এতো টাকা খরচ করে লাভ কী হলো নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন করি। এখন যদি সরকার ধানের মণ ৮০০ টাকা করতো তাহলে মনকে বুঝ দিতে পারতাম।’মৌলভীবাজারে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা

মৌলভীবাজার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিনয় কুমার দেব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মৌলভীবাজার জেলায় সরকারিভাবে ১ হাজার ৪৫৫ টন ধান ও ৭ হাজার ৭০৭ মেট্রিক টন চাল কেনা হবে। ক্রয় সংক্রান্ত এই বরাদ্দের নির্দেশনা ২৭ এপ্রিলে আমাদের কাছে এসেছে। ইতোমধ্যে কুলাউড়া ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় মিলারের মাধ্যমে চাল কেনা শুরু হয়েছে।’

‘হাওর বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের’ কেন্দ্রীয় সভাপতি সিরাজ উদ্দিন আহমেদ বাদশাহ বলেন, ‘এ মৌসুমে সরকার সাড়ে ১১ লাখ টন চাল এবং দেড় লাখ টন ধান কিনবে। সরকার প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা কেজি দরে, সেদ্ধ চাল ৩৬ টাকা কেজি দরে ও ৩৫ টাকা কেজি দরে আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারিভাবে ধান ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহনের পর্যাপ্ত সুযোগ ও বরাদ্দ না থাকায় এ জেলার কৃষকরা মণ প্রতি ধান বিক্রি করছেন ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা। সরকার মিল মালিকদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অথচ ওই মিল মালিকরা ধান চাষ করেন না। তারা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান ক্রয় করে বেশি দামে সরকারের কাছে বিক্রি করেন। এতে কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য হতে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকার কৌশলে ওই সবগুলোই ধান চাল মূলত মিল মালিকের কাছ থেকে কিনতে চান। এই ঘোষণা শুধুমাত্র লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই না। কৃষক বাঁচাতে সরকারের সদয় হওয়া উচিত।’

আরও পড়ুন- যেসব কারণে মাগুরায় বোরো ধানের দাম কম

/এফএস/

লাইভ

টপ