ধান কৃষকের, সুফল পান মিল ও চাতাল মালিকরা

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ১০:৩১, মে ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪১, মে ২৬, ২০১৯

ধানের বাম্পার ফলন হলেও এবার লোকসান গুনছেন চাষিরাকুড়িগ্রামের কৃষকরাও বোরো ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।  সরকারিভাবে ধান কেনার  ঘোষণা দেওয়া হলেও তাতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না তারা। কৃষকরা বল‌ছেন, সরাসরি তাদের  কাছ থেকে ধান না কিনলে এবং খোলা বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধি না হলে কৃষকরা নয়, মিল আর চাতাল মালিকরাই লাভবান হবেন।

জেলার বিভিন্ন ধানের হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,  বোরো ধান রকম ভেদে প্রতিমণ ৪৫০-৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধানের বাজার মূল্য কম হওয়ায় উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না কৃষকরা।  কৃষকরা জানান, এই দামে ধান বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও উঠবে না। আর সরকার যে পরিমাণ ধান কিন‌বে তা জেলায় উৎপা‌দিত ধা‌নের তুলনায় অত্যন্ত নগন্য।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী,  কুড়িগ্রামে ধান চাষির  সংখ্যা ৪ লাখের বেশি।  চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৯১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।  ফলন ভালো হওয়ায় প্রায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৯০০  মেট্রিকটন চাল উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।

জেলার কয়েকজন কৃষক ও কৃষক নেতার সঙ্গে  কথা বলে জানা গেছে, নামকা ওয়াস্তে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হয়। আসলে ধান কেনা হয় মূলত মিল মালিকদের কাছ থেকে। আবার সরকার ধানের চেয়ে চাল কেনে বেশি। কিন্তু গুদামে  কৃষকদের চাল নেওয়া হয় না। চাতাল মালিক কিংবা মিল মালিকদের মাধ্যমে গেলে ধান ও চাল গুদামে  ঢোকে। কৃষকরা নিয়ে গেলে আদ্রতা পরীক্ষা, চিটাসহ নানা অজুহাতে সেই ধান/চাল গুদামের গেট পার হয় না। হয়রানির ভয়ে শেষ পর্যন্ত কৃষকরা মিলারদের কাছে স্লিপ বিক্রি করে দেন।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা উমরমজিদ ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল জানান, তিনি এবার দুই একর জমিতে বোরো চাষ করে প্রায় ১৫০ মণ ধান পেয়েছেন। কিন্তু বর্তমান বাজার মূল্যে ধান চাষ করে লাভ তো দূরের কথা তাকে প্রতি মণে প্রায় ১৭০ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আগামীতে তিনি ধান চাষ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করছেন বলে জানান।

কৃষকদের কাছে ন্যায্য মূল্যে সরকারের ধান ক্রয়ের বিষয়ে এই কৃষক বলেন, ‘এতে কৃষকদের কোনও লাভ নেই। কৃষকরা গুদামে  ধান নিয়ে গেলে নানা অজুহাতে সেই ধান ফেরত দেওয়া হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত কৃষকের ধান মিলারদের কাছে যায়।  খাদ্য বিভাগ ও গুদামে  কর্মকর্তাদের যোগসাজশে  মিলাররাই কৃষক সেজে গুদামে  ধান ঢোকান।’

তিনি আরও জানান, সার, কীটনাশক ও সেচ খরচ না কমালে প্রতিবছর কৃষকদের লোকসানে পড়তে হবে।  এক সময় কৃষকরা হয়তো ধান চাষ থেকে বিমুখ হবে।

কৃষকের আহাজারি কেউ শুনে না। তাদের ভোগান্তিকে পুঁজি  করে রাজনৈতিক দলের নেতা, মিল ও চাতাল মালিক এবং খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা- কর্মচারীরাই লাভবান হন বলে  অভিযোগ করেন উলিপুরের পান্ডুল ইউনিয়নের কৃষক নাছির।

প্রায় তিন একর জমিতে ধান চাষ করে চরম লোকসানে পড়া এই কৃষক বলেন,  ‘খোলা বাজারে ধানের দাম না বাড়লে প্রকৃত কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন না। সরকার যেসব শর্ত দিয়ে ধান কেনে তাতে সাধারণ কৃষকদের ভোগান্তি ছাড়া আর কিছুই মেলে না। উৎপাদ‌নের তুলনায় কৃষ‌কের কা‌ছে ধান নেওয়া হয় খুবই সামান্য।’

নাছির বলেন, ‘গাড়ি বোঝাই করে গুদামে ধান নিয়ে যাওয়ার পর নানা অজুহাতে  তা ফেরত দেন গুদাম কর্মকর্তারা। তখন ওই কৃষকের আরও লোকসান গুনতে হয়। শেষে কৃষক একই ধান যখন মিল মালিকের কাছে হস্তান্তর করে তখন কোনও আপত্তি ছাড়াই ধান গুদামে ঢুকে যায়। সরকার প্রতি বছর ধান কিনলেও প্রকৃত কৃষকরা ধান দিতে পারেন না।’ এজন্য ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের সিন্ডিকেটের পাশাপাশি খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকে দায়ী করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সেচে ভর্তুকি দিলেও এর সুফল কৃষকরা পান না, পায় সেচ পাম্প মালিকরা। অল্প খরচে পানি উঠলেও কৃষকদের কাছে শতক প্রতি নেওয়া হয় ৫০-৬০ টাকা। এছাড়া সার ও কীটনাশকের দাম ধানের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ম‌হিবুল হক বলেন, কুড়িগ্রামে এবার ১৭ হাজার ৬৮১ মেট্রিকটন সেদ্ধ চাল, ১ হাজার ৮৪৩ মেট্রিকটন আতপ  চাল এবং ৩ হাজার ৩০৮ মেট্রিকটন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।ধান কেনার জন্য কৃষক নির্ধারণ ক‌রে কৃ‌ষি বিভাগ। সং‌শ্লিষ্ট উপ‌জেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা সেই তা‌লিকা চূড়ান্ত ক‌রে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার কা‌ছে পাঠান। সেই তা‌লিকা অনুযায়ী গুদা‌মে ধান নেওয়া হয়।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,  বো‌রো চাল সংগ্র‌হের জন্য এবছর ৬৮৮ জন মিল মালিকের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।

 

 

/এসটি/

লাইভ

টপ