সিরাজের হুকুমে নুসরাত হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় ৫ জন

Send
রফিকুল ইসলাম, ফেনী
প্রকাশিত : ২২:৪১, মে ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৭, মে ২৯, ২০১৯

নুসরাত হত্যা মামলার ১৬ আসামিফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মোট ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অভিযোগপত্রে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার হুকুমে নুসরাত হত্যায় পাঁচজনের সরাসরি অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, নুসরাত হত্যায় বাকি ১০ আসামিকে সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বুধবার (২৯ মে) বেলা সোয়া ২টার দিকে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেনের আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক মো. শাহ আলম এই চার্জশিট জমা দেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৬ আসামির মধ্যে ১২ জন নুসরাত হত্যা মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এরমধ্যে নুসরাতকে যৌন হয়রানির কথা স্বীকার করেছে সিরাজ উদদৌলা। এছাড়া, জেলে যাওয়ার পর সে নুসরাতকে হত্যার হুকুম দেওয়ার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার পদ্ধতিও বাতলে দেয়। এমনকি, হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোরও পরামর্শ দেয় সিরাজ।

চার্জশিট অনুযায়ী বাকি আসামিদের কার কী ভূমিকা

নুর উদ্দিন

হত্যাকাণ্ডের আগে যে কক্ষে বোরকা রাখা ছিল তা পরিদর্শন করে নুর উদ্দিন। ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর ভবনের নিচের পরিস্থিতি খুব চতুরতার সঙ্গে সামলে নেয় সে। পুরো ঘটনাকে নাটক বানাতে সহায়তা করে।

শাহাদাত হোসেন শামীম

হত্যাকাণ্ডের ছক সাজানোর বৈঠকে ছিল শামীম। কীভাবে কে কী করবে তার পুরো পরিকল্পনা করে সে। ঘটনার আগে সে কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয়; যে টাকা দিয়ে বোরকা ও কেরোসিন কেনা হয়। তার জবানবন্দি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরকা ও নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালতে ব্যবহৃত গ্লাস উদ্ধার করা হয়।

মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর

ঘটনার পর ২৮ মার্চ সিরাজের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেয় মাকসুদ আলম। শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে না থাকলে আইসিটি পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার হুমকি দিতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেয় সে। হত্যাকাণ্ডের জন্য সে ১০ হাজার টাকা দেয়।

সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের

ঘটনাস্থলে নুসরাতকে শোয়ানোর পর তার পা বাঁধে জোবায়ের। নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢালার পর শামীমের নির্দেশে নিজের সঙ্গে থাকা ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় সে।

জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন

নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালে সাখাওয়াত। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর সে ঠান্ডামাথায় পরীক্ষার হলে যায়। পরে চিৎকার শুনে ছুটে এসে নুসরাতকে দেখতে যায় ছাদে; এমন ভাব করে যেন কিছুই জানে না সে।

হাফেজ আব্দুল কাদের

ঘটনার সময় মেইন গেটের বাইরে পাহারায় ছিল কাদের। সে নুসরাতের ভাই নোমানের বন্ধু। নুসরাত পরীক্ষার হলে ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা, নোমান তা দেখতে চাইলে তাকে বাধা দেয় কাদের। কাদেরের কাছে নুসরাতের বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানায়, ২ মিনিট পর জানাচ্ছি। পরে সে জানায়, নুসরাত গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

আবছার উদ্দিন

ঘটনার সময় গেট পাহারার দায়িত্বে ছিল আবছার। ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও সে নুসরাতের মাকে ফোন করে যৌন হয়রানির অভিযোগে হওয়া মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়।

কামরুন নাহার মনি

মনিকে দুই হাজার টাকা দিয়ে বোরকা ম্যানেজ করতে বলে শামীম। ওই টাকায় মনি দু’টি বোরকা ও হাতমোজা কেনে। পরে ওই দুই বোরকা ও তার নিজের একটি বোরকাসহ মোট তিনটি বোরকা ওই ভবনের তৃতীয় তলায় রেখে আসে। ছাদে নেওয়ার পর নুসরাতকে শোয়ানোর কাজে সহায়তা করে এবং নুসরাতের বুকের ওপর হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখে সে। ঘটনার পর ঠান্ডামাথায় এসে সেও পরীক্ষায় অংশ নেয়।

উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা ওরফে শম্পা

নুসরাতকে ছাদে নেয়ার পর মামলা তুলে নিতে নুসরাতের মাকে প্রথমে ফোনে চাপ দেয় সে। রাজি না হওয়ায় নুসরাতের গায়ের ওড়না খোলে সে। এরপর ওই ওড়না ছিঁড়ে দুই ভাগ করে, যা দিয়ে নুসরাতের হাত ও পা বাঁধা হয়। নুসরাতের হাত পেছনে নিয়ে বাঁধার পর কেরোসিন ঢালার গ্লাসটি নুসরাতের হাতে ধরিয়ে দেয়; যাতে বোঝা যায় নুসরাত আত্মহত্যা করেছে।

আব্দুর রহিম শরীফ

বাইরের গেটে পাহারায় ছিল শরীফ। নুসরাতের ভাই ভেতরে ঢুকতে চাইলে বাধা দেয় সে।

ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন ও মহিউদ্দিন শাকিল

তারাও গেটে পাহারায় ছিল। সবকিছু স্বাভাবিক বোঝাতে যা যা করণীয় তা করছিল তারা।

মোহাম্মদ শামীম

প্রথমে পপির সঙ্গে ভবনটির গেটে পাহারায় ছিল শামীম; যাতে কেউ সে সময় ভবনে উঠতে না পারে।

রুহুল আমিন

ঘটনার পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে পুলিশ প্রশাসন ম্যানেজ করার আশ্বাস দেয় রুহুল আমিন। নুসরাত হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে যা যা করার সব করে সে। ঘটনার পর শামীমের সঙ্গে দুই দফা ফোনে কথা বলে সবকিছু নিশ্চিত করা হয়।

/এমএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ