ইয়াবা ডন সাইফুলের উত্থান-পতন

Send
আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
প্রকাশিত : ০২:৫৯, জুন ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৮, জুন ০১, ২০১৯

শুধু কক্সবাজারের নয়, পুরো দেশের ইয়াবা ডন খ্যাত টেকনাফের হাজি সাইফুল করিম শুক্রবার ভোরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় এ ইয়াবা ডন তার এই অবৈধ ব্যবসায়ের মাধ্যমে নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছিল। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে গড়ে তুলেছিল বিশেষ সখ্যতা। রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক থেকে শুরু দেশের নামকরা ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার দহরম মহরম সম্পর্ক। অথচ গত ১০ বছর আগেও তার পরিবারের ‘নুন আনতে পান্তা পুরিয়ে যাওয়া’র মত অবস্থা ছিল।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সদর ইউনিয়নের শিলবুনিয়া পাড়া এলাকার হানিফ ডাক্তারের ছেলে সাইফুল করিম। স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের সংসারে ৬ ভাই ২ বোনের মধ্যে সাইফুল করিম মেজ ছেলে। ১৯৯৪ সালের দিকে স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি টেকনাফ হাই স্কুলের সামনে পিতার ফার্মেসিতে সময় দিতেন। পরে এসএসসি পাস করে উচ্চ শিক্ষার আশায় পাড়ি জমান চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম মহসিন কলেজ পড়াশোনাকালে ১৯৯৮ সালের দিকে নগরীর খাতুনগঞ্জ এলাকায় টেকনাফের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের পণ্য বিক্রিতে সহায়তা করে খরচ যোগাতেন তিনি। এভাবেই কোনও রকম অভাব অনটনে দিন চলতো। কিন্তু তার অভাব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ধীরে ধীরে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ে সাইফুল হয়ে উঠে দেশের শীর্ষ ইয়াবা কারবারি।

যেভাবে উত্থান:

মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার মংডু থানায় রয়েছে সাইফুলের দাদার বাড়ি। এর সুবাদে মংডু এলাকার ইয়াবা ডন খ্যাত মিয়ানমারের মোস্ট ওয়ান্টেড ‘মগা সুইবিন’ নামক এক আন্তর্জাতিক ইয়াবা কারবারির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে সাইফুলের। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০০ সালের কাছাকাছি সময়ে টেকনাফ স্থলবন্দরে এসকে ইন্টারন্যাশনাল নামে আমদানিকারক ও ‘সিএন্ডএফ’ ব্যবসা শুরু করে সাইফুল। এই সিএন্ডএফ ব্যবসায় মিয়ানমার থেকে বেশিরভাগ কাঠ আমদানি করা হতো। ওই কাঠ আমদানির আড়ালে ইয়াবার প্রথম চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসে সাইফুল।

ওই সময়ে ইয়াবা ট্যাবলেট সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন ধারণা না থাকায় ক্রমেই বাড়াতে থাকে তার এ অবৈধ ব্যবসা। খুব দ্রুত মাফিয়া হয়ে উঠে সাইফুল। ২০০১ সালের দিকে সরকারের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে টেকনাফের বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহর সঙ্গে হাত মিলিয়ে তার বোনকে বিয়ে করে টেকনাফ স্থলবন্দর নিয়ন্ত্রণে নেয়। বিএনপি সরকারের আমলে ওই সময়ে টেকনাফে দলটির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মো. আবদুল্লাহ। প্রভাবশালী বিএনপি নেতার আধিপত্য কাজে লাগিয়ে স্থলবন্দরে মিয়ানমার থেকে পণ্য অমদানির আড়ালে কৌশলে ইয়াবা আমদানি শুরু করে সাইফুল। 

ক্ষমতার পালাবদল:

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পর কৌশলে ভোল পাল্টে হাত করে নেয় আলোচিত সমালোচিত উখিয়া-টেকনাফের সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদিকে। প্রভাবশালী এমপি বদির পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক ইয়াবার চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসলেও কেউ টুঁ শব্দ করেনি। ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদরা সাইফুলকে প্রশ্রয় দিতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, স্থল ও নৌপথে পাচার হওয়া সাইফুলের ইয়াবার চালান আটকের সাহস পেত না সরকারের কোনও সংস্থা।

যেভাবে আসতো ইয়াবার চালান:

টেকনাফ স্থলবন্দরে সিএন্ডএফ এজেন্ট হিসেবে মিয়ানমার থেকে কাঠ আমদানির আড়ালে ইয়াবার চালানের বিষয়টি যখন ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে শুরু করে, তখন রুট পরিবর্তন করে সাগর পথে মাছ ধরার ট্রলারে ইয়াবার চালান এনেছে হাজি সাইফুল করিম। ওসব ইয়াবার চালান খালাস করা হয়েছে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে। ইতোপূর্বে পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করলেও বছর পাঁচেকের মধ্যে বেশি ইয়াবা এনেছে হাজি সাইফুল। চট্টগ্রামের বন্দর ও কোতোয়ালি থানার কতিপয় অসৎ পুলিশ পাহারা দিয়ে হাজি সাইফুলের ইয়াবার চালান গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে সহযোগিতা দিয়েছে। একের এক চালান বাংলাদেশে ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ায় তার প্রতি বিশ্বাস জমতে থাকে মিয়ানমারের ইয়াবা উৎপাদনকারীদের। এ কারণে দেশটিতে স্থাপিত ৩৮টি ইয়াবা কারখানার বাংলাদেশে একমাত্র এজেন্ট সাইফুল করিম। তাই বাংলাদেশে পাঠানো ইয়াবার টাকা উসুলে সাইফুল করিমকে একমাত্র জিম্মাদার বানিয়েছে মিয়ানমারের কারখানা মালিকরা। এজন্য মিয়ানমারের ওসব ফ্যাক্টরি থেকে চালান আসতে শুরু করে তার নামে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ ও অঢেল টাকা জমানো ছাড়াও ইয়াবা ব্যবসার সুবিধার্থে সাইফুল মিয়ানমার ও বাংলাদেশে চলাচলের জন্য একাধিক জাহাজ কিনেছে। যদিও বা কাগজে-কলমে সে টেকনাফ স্থলবন্দরের একজন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী।

যেভাবে পতন:

একের পর এক বড় বড় ইয়াবার চালান লেনদেন করা সাইফুল দিন বেপরোয়া হয়ে উঠে। পুলিশের ওসি বা এসপি সমমানের কোনও কর্মকর্তা তাকে আটকের সাহস করেনি। ফলে তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সংক্রান্ত কোনও মামলা তো দূরের কথা, কোন ধরনের প্রমাণও ছিল না। তবে বিপত্তি দেখা যায় ২০১৭ সালের দিকে। হঠাৎ করে কয়েকটি মাদক মামলায় আসামি হয়ে পড়ে সাইফুল করিম। ২০১৮ সালে কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় এক হাজার ১৫১ জনের মধ্যে এক নাম্বারে রয়েছে সাইফুল করিমের নাম।

ওই বছরের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ ঘোষণার পর নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সারাদেশে জোরালো অভিযান শুরু করে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এরপর কোনও উপায় না দেখে গা ঢাকা দেয় সাইফুল। কৌশলে পালিয়ে যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে গুজব ছড়ানো হয় সে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে অবস্থান করছে, যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি ইয়াঙ্গুনে থাকে। পরে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রথম দফায় ১০২ ইয়াবা কারবারির আত্মসমর্পণের সময় সাইফুলের আত্মসমর্পণের বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় আসে। কিন্তু, সব জল্পনা কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ থেকে বিরত থাকে হাজি সাইফুল করিম।

প্রথম দফা আত্মসমর্পণের পর ইয়াবা কারবারিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে দ্বিতীয় দফা আত্মসমর্পণের সুযোগ ঘোষণা করে  আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘোষণায় সর্বশেষ ২৬ মে রাত ১১টার দিকে দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে সাইফুল। সেখানে পুলিশ সদর দফতরের একটি বিশেষ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় সে। অবশ্য, পুলিশের পক্ষ থেকে বার বার বিষয়টি অস্বীকার করা হচ্ছে।

টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, ‘দেশের এক নাম্বার ইয়াবা ডন সাইফুল করিমকে গ্রেফতারের পর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে পুলিশের কাছে স্বীকার করছে যে, গত কয়েক দিন আগে ইয়াবার একটি বড় চালান ইঞ্জিনচালিত বোটযোগে মিয়ানমার থেকে এনে টেকনাফের সদর স্থলবন্দরের সীমানা প্রাচীরের শেষ প্রান্তে নাফ নদীর পাড়ে মজুদ করেছে। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইয়াবা উদ্ধারের জন্য শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশের একটি দল তাকে নিয়ে সেখানে পৌঁছালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা তার অস্ত্রধারী সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছুঁড়লে আটককৃত মো. সাইফুল করিম (৪৫) গুলিবিদ্ধ হয়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনাস্থলের আশপাশ এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি করে ৯টি এলজি, ৪২টি রাউন্ড শর্টগানের তাজা কার্তুজ, ৩৩ রাউন্ড কার্তুজের খোসা এবং এক লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।’

এদিকে ঢাকা পুলিশের সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘ইয়াবা ডন সাইফুলকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে যা পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে আসবে। কারা তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, আর্থিক সুবিধা নিয়েছে কারা তাদের প্রত্যেকের নাম সে বলে দিয়েছে। এরমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন। আমরা এসব ব্যক্তিদের ধীরে ধীরে আইনের আওতায় নিয়ে আসব।

উল্লেখ্য, ইয়াবা ডন সাইফুল করিম ছাড়াও চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৭১ মাদক কারবারি। এরমধ্যে পুলিশের সঙ্গে ২১, বিজিবি’র সঙ্গে ১৫, র‌্যাবের সঙ্গে ১৬ ও ইয়াবা কারবারিদের দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে ১৯ জন নিহত হয়েছে।

/এমপি/

লাইভ

টপ