বড় ভাইয়ের জায়গায় ছোট ভাইয়ের কারাভোগ, ওসিকে জবাব দিতে নির্দেশ

Send
রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২২:৪২, জুন ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫০, জুন ১২, ২০১৯

কারাভোগ করা সজল মিয়ারাজশাহীতে বড় ভাই ফজলের বদলে গ্রেফতার হওয়া ছোট ভাই সজল মিয়াকে (৩৪) প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর আদালত অব্যাহতি দিয়েছেন। সেইসঙ্গে আসামি না হয়েও কেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামি হিসেবে সজলকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তার জবাব দিতে রাজশাহী মহানগর পুলিশের শাহমখদুম থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজকে শোকজ করেছেন আদালত। বুধবার (১২ জুন) দুপুর ৩টার দিকে রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের (প্রথম) বিচারক মো. মনসুর আলম এ আদেশ দেন।

আদেশ অনুযায়ী, ওসি মাসুদ পারভেজকে সাত দিনের মধ্যে আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে জবাব দিতে হবে। ৩০ এপ্রিল সজলকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০১ সালে আসামি ফজলের বয়স ছিল ২৭ বছর। বর্তমানে তার বয়স ৪৫ বছর। কিন্তু, সজলের জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ৩৫ বছর। এছাড়া ফজল মামলার রায়ের আগে একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। তখন তার শারীরিক গঠন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এখন আবার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, গ্রেফতার সজলের সঙ্গে সে বর্ণনার উল্লেখযোগ্য তারতম্য রয়েছে। পুলিশ ভুল করে তাকে ফজল ভেবে গ্রেফতার করেছে।

সজল রাজশাহী নগরীর ছোটবনগ্রাম পশ্চিমপাড়া এলাকার তোফাজ উদ্দিনের ছোট ছেলে। সজলের বড় ভাইয়ের নাম সেলিম ওরফে ফজল। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় ২০০৯ সালে ফজলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। রায় ঘোষণার আগে থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন।  ৩০ এপ্রিল শাহমখদুম থানা পুলিশ সজলকে গ্রেফতার করে। এরপর ফজল হিসেবে সজলকে কারাগারে পাঠানো হয়। সজলকে যখন আদালতে উপস্থাপন করা হয়, তখন তার নাম ফজল বলেই পুলিশের গ্রেফতারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দুইজন সাক্ষী এ ব্যাপারে এফিডেফিট করে দেওয়ায় তাকে সেদিন কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু, ২৬ মে সজল আসামি নন দাবি করে আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের মুক্তির জন্য আবেদন করেন। এরপর মঙ্গলবার (১১ জুন) শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। এ দিন আদালত না বসায় পরদিন আবারও শুনানি হয়। প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর বুধবার (১২ জুন) অব্যাহতি পেলেন সজল।

সজলের ভাই-বোনেরা আদালতে এফিডেফিট করে জানান, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফজল দীর্ঘদিন ধরেই নিখোঁজ রয়েছেন। তারা ফজলের কোনও খোঁজ জানেন না। তিনি বেঁচে আছেন কিনা তারা সেটিও জানেন না। আর ফজল হিসেবে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি আসলে সজল। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সজলকে দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। তবে আদালতের আদেশের পর তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আদালত থেকে আদেশের অনুলিপি সেখানে পাঠানো হবে। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখবেন, তার বিরুদ্ধে অন্য কোনও মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কিনা। তা না থাকলে সজলকে মুক্তি দেওয়া হবে। বুধবার আদালত থেকে সজল হাসিমুখেই কারাগারে গেছেন।

সজলের আইনজীবী মোহন কুমার সাহা বলেন, ‘অপরাধী না হয়েও সজল কয়েদি হিসেবে সাজা ভোগ করেছেন। তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। ওসির শোকজের জবাব পাওয়ার পর আদালত এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটির জন্য আমরা অপেক্ষা করবো। তারপর প্রয়োজনে মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা ভুক্তভোগী সজলের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি করে আদালতে আবেদন করবো।’

বিনাদোষে গ্রেফতার করায় শাহমখদুম থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজের শাস্তি দাবি করে সজলের ভাই মো. বাবু  বলেন, ‘সজলকে গ্রেফতারের পর আমরা অনেক বুঝিয়েছি। ওসি কোনও কথা শোনেননি। ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাসে আমাদের সন্ধ্যা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বসিয়ে রেখেছিলেন থানায়। তারপর সকালে আসতে বলেন। আমরা আবার ভোর ৬টায় থানায় যাই। দুপুর পর্যন্ত বসিয়ে রেখে সজলকে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেড় মাস ধরে আমরা হয়রানির শিকার হলাম। তাই ওসির শাস্তি চাই।’

আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর দায়ে ওসির শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু, এখানে দুজন সাক্ষী ওসিকে এফিডেভিট করে দিয়ে বলেছিলেন, এটাই আসামি। তাই ওসির জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আদালতই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন।’

রাজশাহী নগরীর শাহমখদুম থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজে বলেন, ‘নির্দোষ ব্যক্তি কারাভোগ করুক, এটা আমরা চাই না। তবে দুজন সাক্ষী এফিডেভিট করে দেওয়ায় সজলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতের কাগজ পাইনি। পাওয়ার পর পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবো।’

 

/এনআই/

লাইভ

টপ