প্রধানমন্ত্রীর উপহার পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়

Send
ইব্রাহিম রনি, চাঁদপুর
প্রকাশিত : ১৫:০২, জুন ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩৩, জুন ৩০, ২০১৯

চাঁদপুরে অকেজো পড়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার নৌ অ্যাম্বুলেন্সচাঁদপুরে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহার নৌ অ্যাম্বুলেন্স। জেলার চরাঞ্চলবাসীর জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য এ নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি দেওয়া হলেও তা অচল হয়ে পড়ে আছে ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভেতরে ময়লা-আবর্জনা জমে এটি এখন নষ্ট হওয়ার পথে। ‘ব্যবহারের সুযোগ কম’−এই কথা বলে কর্তৃপক্ষ এখন এটি অন্য কোথাও হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন।

চাঁদপুরের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুর-৩ আসনের এমপি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির অনুরোধে উপহার হিসেবে চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলার রাজরাজেশ্বর, ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নসহ চরাঞ্চলের মানুষের দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর এ নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ২২ অক্টোবর এই নৌ অ্যাম্বুলেন্সের চাবি হস্তান্তর করা হয় ডা. দীপু মনি ও চাঁদপুরের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে। পরে সেটি চাঁদপুরে আনা হলে আনন্দের কমতি ছিল না এখানকার মানুষের মধ্যে। কিন্তু চালক নিয়োগ না হওয়ায় এবং দাফতরিক জটিলতায় গত আট মাস ধরে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি পড়ে আছে শহরের মুখার্জিঘাট এলাকার ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে।চাঁদপুরে অকেজো পড়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার নৌ অ্যাম্বুলেন্স

চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য অফিস ও সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলায় পৃথক কোনও হাসপাতাল নেই। তাই ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালেই সদর উপজেলাসহ পুরো জেলার রোগীরা চিকিৎসাসেবা নেন। আর এ কারণে চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলবের চরাঞ্চলের রোগীদের মেঘনা পাড়ি দিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য আনা-নেওয়ার কাজে এ অ্যাম্বুলেন্সটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এ ধারণা থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লেখেন চাঁদপুরের সিভিল সার্জন। এরপর এটি ব্যবহারে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় নতুন করে শুরু হয় তোড়জোড়। সর্বশেষ গত মে মাসে চাঁদপুর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালকে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে একটি চিঠি দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু এ অবস্থায় তারাও এটি ব্যবহার করতে ব্যর্থ হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি ময়লা পড়ে নষ্ট হচ্ছে

মেঘনা পারের রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হযরত আলী ব্যাপারী বলেন, ‘আমাদের এমপি ডা. দীপু মনি আপা চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার চিন্তা করে জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার অনুরোধ করেন। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ রক্ষা করেন। এটি আসার পর আমরা ভেবেছিলাম, নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চলাচল করলে আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা আরও সহজতর হবে। কিন্তু এটি এখনও কাজ শুরুই করতে পারেনি। চরাঞ্চলের মানুষগুলো টেম্পু বা ট্রলারে করে চাঁদপুর হাসপাতালে আসতে বেশি সময় লাগে। এই নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে যদি কার্যকর ভূমিকা রাখে, তাহলে বিশেষ উপকার হবে। তাই আমরা সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ জানাই, যেন দ্রুত এটি চালু করা হয়।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক এডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির অনুরোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা চাঁদপুরের চরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগণের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি দিয়েছেন। তাই এটি এভাবে ফেলে না রেখে যথাযথ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে এবং যথাযথভাবে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে মানুষের সেবা নিশ্চিত করা দরকার।’নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি ময়লা পড়ে নষ্ট হচ্ছে

এদিকে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের খুব প্রয়োজন না থাকায় এটি অন্যত্র হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে বলে জানালেন চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদা বেগম। তিনি বলেন, ‘কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার বিভাগ (সিবিএইসি) থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটি আমাদের দিয়েছিলেন। নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি বর্তমানে চাঁদপুর শহরের মুখার্জিঘাট এলাকায় ডাকাতিয়া পাড়ে রাখা হয়েছে। এটি ভালো আছে। আমরা এটিকে নৌ ফায়ার সার্ভিস জেটিতে রাখার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু তারা অনীহা প্রকাশ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সদর উপজেলায় যেহেতু বহিঃবিভাগ, আন্তঃবিভাগ এবং জরুরি বিভাগ কার্যক্রম চালু নেই, তাই চাঁদপুর সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল কিংবা হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি ব্যবহারের সুযোগ বেশি রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা সিবিএইচসিতে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেই এবং সেখান থেকে গত ২৩ মে একটি চিঠি আসে আমাদের কাছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, চাঁদপুর আড়াইশ’ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল তাদের প্রয়োজনে রোগীদের বহন করার জন্য ব্যবহার করতে পারবে। এটি নিয়ে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আরও ভাবছে। আমি জানতে পেরেছি, আরেকটি চিঠির মাধ্যমে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি সম্পূর্ণভাবে আড়াইশ’ শয্যা হাসপাতাল বা হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হস্তান্তর করা হতে পারে।’চাঁদপুরে অকেজো পড়ে আছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার নৌ অ্যাম্বুলেন্স

চাঁদপুর ২৫০ শয্যা সরকারি জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আনোয়ারুল আজিম বলেন, ‘নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি আমাদের ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে কি না এ সম্পর্কিত কোনও চিঠি এখনও আমরা হাতে পাইনি। তবে এটি যদি আমাদের ব্যবহারের জন্য দেওয়াও হয়, তাতেও সমস্যা থেকে যাবে। চালক নিয়োগ না করা হলে এবং জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে এটি আমরাও ব্যবহার করতে পারবো না। সড়কের গাড়িচালক দিয়ে তো আর নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালানো যাবে না। সেক্ষেত্রে এটি পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাবে।’

নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির অকেজো পড়ে থাকার বিষয়ে চাঁদপুরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। চালক ও জ্বালানির ব্যবস্থা না হলে এটার কোনও কাজ নেই। তাই চাঁদপুর ৩ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দীপু মনির সঙ্গে পরামর্শ করেই নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের আশা তারা এটা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারবে।’



 

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ