নাটোরে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের পাঁচটি স্কুল ১৬ মাস ধরে বন্ধ

Send
কামাল মৃধা, নাটোর
প্রকাশিত : ১১:৩২, জুলাই ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৯, জুলাই ০১, ২০১৯

বন্ধ হওয়ার আগে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলঢাকার হলি আর্টিজান হামলায় নিহত অবিন্তা কবিরের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত নাটোরের অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুলের পাঁচটি শাখাই ১৬ মাস ধরে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। ইতোমধ্যেই ১৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬০ ভাগ ঝরে পড়েছে। হতাশায় দিন কাটাচ্ছে বাকি ৪০ ভাগের। শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী সংস্থার দাবি, কর্তৃপক্ষ ফান্ড বন্ধ করে দেওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, কথা মতো কাজ না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে বন্ধ করেছেন স্কুলগুলো।

২০১৬ সালে হলি আর্টিজান হামলায় অবিন্তা কবির নিহত হওয়ার পর তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুল নামে ঢাকায় দুটি এবং নাটোরে পাঁচটি স্কুল চালু করা হয়। অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে নাটোরের সিংড়া উপজেলায় কর্মরত পিকেএসএস এনজিও সংস্থা এই শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি। সিংড়া পৌর এলাকার নিঙ্গোইন উত্তরপাড়া,  একই এলাকার ঘুন পাড়া, পাটকোল, তাজপুর ইউনিয়নের পার চক হরিপুর এবং সুকাশ ইউনিয়নের জয়কুড়ি এলাকায় স্কুলগুলো চালু করা হয়।

নাটোরের এই পাঁচটি শাখায় ভর্তি হয় ১৫০ জন শিক্ষার্থী। অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়া শিশুরাই মূলত এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পড়ানো হতো সেখানে। নিয়োগ করা পাঁচ জন শিক্ষক, একজন প্রজেক্ট অফিসার, একজন মনিটরিং অফিসার এবং একজন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে এবং আগ্রহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বছরজুড়ে সরবরাহ করা হয় প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী। সমাজের দরিদ্র, বঞ্চিত, খেটে খাওয়া মানুষদের পরিবারের সন্তানরা স্বপ্ন দেখতে থাকে অন্তত পঞ্চম শ্রেণি পাসের। কিন্তু মাত্র এক বছর পরেই ২০১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভেঙে যায় শিশুদের স্বপ্ন।

সরেজমিনে উত্তর নিঙ্গোইনসহ পাঁচটি স্কুল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সব স্থানেই বিদ্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। উত্তর নিঙ্গোইন শাখার শিক্ষার্থী মিনার মা আনোয়ারা জানান, গত বছর থেকে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তাদের পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় মিনাকে আর অন্য কোনও স্কুলে ভর্তি করেননি।

জিজ্ঞেস করা হলে মিনা জানায়, সে এখন সারাদিন বাড়িতেই থাকে। পড়ালেখা করতে না পারায় তার খুব খারাপ লাগে।

আরেক ছাত্রী রুমার মা বিলকিস বেগম জানান, অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন স্কুল বন্ধ হওয়ার পর রুমাকে তিনি স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। তবে মাঝে মাঝে রুমার বাবা তাকে স্কুলে যেতে দেয় না। মেয়েকে শেষ পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুল পাস করাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে তিনি রয়েছেন শঙ্কায়। তবে অবিন্তা ফাউন্ডেশন স্কুল চালু থাকলে সব শিক্ষা সামগ্রী পাওয়ার কারণে হয়তো লেখাপড়া বন্ধ হতো না।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে শিক্ষা বাস্তবায়নকারী সংগঠন পিকেএসএস এর নির্বাহী পরিচালক ডেইজি আহমেদ জানান, ‘শিক্ষা কার্যক্রম পাঁচ বছর চলবে বলে আমরা মৌখিকভাবে জানতে পেরেছিলাম। তবে লিখিত চুক্তি হয়েছিল এক বছরের। প্রতিবছর নতুন করে চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৮ সালে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসে কর্তৃপক্ষ আমাকে জানায়, তারা আর কন্টিনিউ করবেন না। বাধ্য হয়ে আমি স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে ডেইজি আহমেদ জানান, ‘১৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী ইতোমধ্যেই ঝরে পড়েছে। বাকি ৪০ ভাগ বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে ওই সব শিশুদের শিক্ষা ও শঙ্কায় রয়েছে।’অবিন্তা কবির ও তার মা রুবা আহমেদ

বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের গ্যালারি কিউরেটর সুলতান মোহাম্মদ মইনুদ্দিন জানান, ‘শিক্ষা বাস্তবায়নকারী সংগঠনের সঙ্গে শিক্ষা বাস্তবায়ন বিষয়ে যে সব কথা হয়েছিল, পরিদর্শনে তার সত্যতা না পাওয়ায় স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সুলতান দাবি করেন, ঢাকার গুলশানে একটি শাখা চালু রয়েছে। ওই শাখায় প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের শিক্ষা সামগ্রীর পাশাপাশি দুপুরের খাবার পর্যন্ত ফাউন্ডেশন থেকে দেওয়া হয়। এই শাখায় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার শেষ ধাপ পর্যন্ত সম্পন্ন করে তাদের প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়ার চিন্তা রয়েছে ফাউন্ডেশনের।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সুলতান আরও জানান, ‘অবিন্তা ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার অকাল মৃত্যুতে অবিন্তার মা রুবা আহমেদ সব কিছু দেখাশোনা করছেন।’ তিনি দাবি করেন, ‘নাটোরসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে গেলে যে জনবল প্রয়োজন তা আমাদের নেই। বিষয়টি আপাতত পর্যালোচনায় রয়েছে। তবে নাটোরের স্কুলগুলো পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত নেই। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কিনা তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।’

 

/এফএস/

লাইভ

টপ