হিজড়াদের জন্য আবাসন হচ্ছে শেরপুরে

Send
শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর
প্রকাশিত : ১২:৪৯, জুলাই ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০১, জুলাই ০৫, ২০১৯

হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন হচ্ছে শেরপুরেভোটাধিকার পাওয়ার পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে দেশের প্রথম জেলা হিসেবে শেরপুরে হিজড়া সম্প্রদায়ের ৫২ জন সদস্যের বাসস্থান তৈরির জন্য দুই একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের কবিরপুর মৌজার আন্ধারিয়া গ্রামে হিজড়াদের জন্য এ আবাসন তৈরি করা হবে।

জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব বলেন, ‘অবহেলিত এ সম্প্রদায়কে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে হিজড়াদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের বাসস্থানের জন্য আমরা চিঠি পাঠিয়েছিলাম। ইতোমধ্যেই তা অনুমোদিত হয়েছে। শেরপুর সদরের আন্ধারিয়া গ্রামে হিজড়াদের জন্য দুই একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। সেখানে তাদের বাসস্থান করে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হিজড়াদের জন্য ভীষণ আন্তরিক। কেবল বাসস্থান নয়, ওই আবাসন প্রকল্পে হিজড়াদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সেলাই মেশিন, হাঁস-মুরগী, গবাদি পশুপালন, মৎস্য চাষসহ বিভিন্ন ধরনের আত্মকর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’

পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, ‘আমরা হিজড়াদের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমানের উন্নয়ন নিয়ে ভাবছি। মোটকথা তারা যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সমাজের আর অন্য দশজনের মতো চলাফেরা-কাজকর্ম করতে পারে, সেজন্য তাদের উপযোগী কার্যক্রম গ্রহণ করতে প্রচেষ্টা চলছে।’

শেরপুর জেলা হিজড়া কল্যাণ সমিতির সভাপতি নিশি সরকার বলেন, ‘ভিক্ষাবৃত্তি, উৎসব-অনুষ্ঠানে হানা দিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করে কিংবা জোরজবরদস্তি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করেই চলছে হিজড়াদের দিনকাল। তবে শেরপুরে এখন এসব ঘটনা অনেকটা কমে এসেছে। শহরের বাগরাকসা এলাকার একটি টিনশেড ভাড়া বাড়িতে ১৬ জন হিজড়াকে নিয়ে ছোট দুটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসবাস করছি। আমাদের গুরু মা মোর্শেদা বেগম আরও ১৫/১৬ জন হিজড়াকে নিয়ে বাস করেন শহরের গৌরিপুর এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে। আসলে আমরা সমাজে ভীষণভাবে অবহেলিত।আমাদের দেখে মানুষ হাসে, ঘৃণা করে। কিন্তু আমাদের যে কত কষ্ট তা মানুষ বোঝে না। পরিবারে আমাদের স্থান নেই, সমাজ আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে। কিন্তু আমরা সমাজে সবার সঙ্গে  মিলেমিশে থাকতে চাই, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। আমাদের থাকা খাওয়ার কোনও নিশ্চয়তা নাই, ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। বাধ্য হয়ে আমাদের পথে নামতে হয়। কিন্তু আমরাওতো মানুষ। আমাদের থাকার জায়গা দরকার। লেখাপড়া করা দরকার। বিনোদন দরকার, কাজের সুযোগ দরকার। সর্বোপরি আমরা মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু সমাজের কাছে আমরা মূল্যহীন থাকায় কারও ওপরেই আমাদের আস্থা ছিলো না।’

নিশি সরকার আরও বলেন, ‘এখন আমরা আমাদের যেকোনও প্রয়োজনে ডিসি-এসপি স্যারের সঙ্গে একসঙ্গে বসতে পারি। অনুষ্ঠানেও দাওয়াত পাই। তারা আমাদের দাওয়াত করে খাইয়েছেন। গেল রমজানের রোজায় এসপি স্যার (কাজী আশরাফুল আজীম) আমাদের শেরপুরের সব হিজড়াদের নিয়ে ইফতার মাহফিল করেছেন। ঈদে সবাইকে শাড়ি ও সেমাই-চিনি উপহার দিয়েছেন। ঈদের দিন দুপুরে  হুইপ আতিক এমপি স্যারসহ সমাজের গণ্যমাণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একসঙ্গে  আমাদের দাওয়াত খাইয়েছেন। ডিসি স্যারও (আনার কলি মাহবুব) ঈদ উপহার হিসেবে এবার আমাদের সবাইকে চাল-ডাল, সেমাই, সুজি, চা, নারকেল তেল ও প্রসাধনীসহ ১৪ প্রকারের জিনিস দিয়েছেন। ঈদ কার্ড দিয়েছেন। হুইপ স্যার (হুইপ আতিউর রহমান আতিক) , জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুমান ভাই (হুমায়ুন কবীর রুমান), সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানু ভাই (ছানুয়ার হোসেন ছানু) এবং সাবেক মহিলা এমপি শ্যামলী আপা (ফাতেমাতুজ্জহুরা শ্যামলী)  আমাদের ঈদ উপহার দিয়েছেন। আগেতো কেউ আমাদের খোঁজ নেওয়া দূরের কথা,  সবাই দীর দীর ছি ছি করতো। এখন অনেকেই আমাদের ডাকে, আদর করে উপহার দেয়। এই জন্যই এখন আমরা তাদের কথায় ভরসা পাই, আশ্বস্ত হই।’

জেলা হিজড়া কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদা বেগম বলেন, ‘আমরা পথে পথে ঘুরতে চাই না, কাউকে অত্যাচার করতে চাই না। আমরা ভালোভাবে বাঁচতে চাই। আমাদের জন্য কিছু করলে আমরা উপকৃত হবো।’

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘জনউদ্যোগ’ শেরপুর কমিটির মাধ্যমে শেরপুরে হিজড়া জনগোষ্ঠিকে সংগঠিত করে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে তাদের আবাসন ও কর্মসংস্থানের দাবিতে ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর ‘শেরপুরে হিজড়া জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভা করা হয়। হিজড়াদের নিয়ে জেলায় এটাই ছিলও প্রথম বড় কোনও আয়োজন।

জনউদ্যোগ শেরপুর কমিটির আহ্বায়ক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা সবসময় তাদের দেখলেও আড়ালে থাকা একটি জনগোষ্ঠিকে আলোতে আনতে চেয়েছি। হিজড়া জনগোষ্ঠিকে নিয়ে শেরপুরে জনউদ্যোগের ভাবনা স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বমহলে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। হিজড়াদেরও তাদের চিরায়ত আঁধার থেকে বের করে আনতে নানাভাবে কাউন্সিলিং করা হচ্ছে। সমাজের লোকজনও নানাভাবে এগিয়ে এসেছেন। এক্ষেত্রে সবকিছু মিলিয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠির জীবনমানের উন্নয়নের বিষয়টি এখন একটি পরিণতির দিকে যাচ্ছে।’



 

 

/এফএস/

লাইভ

টপ