গাইবান্ধায় ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট

Send
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৬:২৮, জুলাই ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৭, জুলাই ১৭, ২০১৯





গাইবান্ধায় বন্যাগাইবান্ধায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে চার উপজেলার ৩২ ইউনিয়নের আড়াই শতাধিক গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। গত দুই দিনে ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ছয়টি জায়গা ধসে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৩০টি গ্রাম। বাঁধের আরও বেশ কয়েকটি জায়গা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছেন আশপাশের লোকজন।



উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে গাইবান্ধার সবকটি নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে চার উপজেলায় পানিবন্দি অবস্থায় আছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা আরও বেশি।গাইবান্ধায় বন্যা
জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, বন্যার পানিতে অন্তত ৩০ হাজার কাঁচা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩০০ খামার, পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। নষ্ট হয়েছে বীজতলা, সবজিসহ প্রায় চার হাজার জমির বিভিন্ন ফসল। অন্তত ২০ কিলোমিটার কাঁচা-পাকা রাস্তাসহ সাতটি ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই মধ্যে খোলা হয়েছে ১২৫টি আশ্রয়কেন্দ্র। মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। এরই মধ্যে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন বানভাসী মানুষরা।গাইবান্ধায় বন্যা
এদিকে বুধবার (১৭ জুলাই) সকাল থেকে বন্যার পানি তীব্র গতিতে ঢুকতে শুরু করে গাইবান্ধা শহরে। দুপুর ১টার মধ্যে পানিতে থৈ থৈ করছে শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়ি, অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ডেভিট কোম্পানি পাড়া, মুন্সিপাড়া, কুটিপাড়া, নতুন বাজার, পুরাতন বাজার, ব্রিজ রোড, মমিনপাড়া, পুলবন্দি, বানিয়ারজান ও কালিবাড়িসহ বিভিন্ন পাড়ামহল্লার অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। গাইবান্ধা-বাদিয়াখালী সড়কের উপর দিয়েও তীব্র স্রোতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে সড়কের উপর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলাচল করছে বিভিন্ন যানবাহনসহ সাধারণ মানুষ। এছাড়া গাইবান্ধা-বাদিয়াখালি সড়কের পোড়াগ্রাম সাধুর আশ্রম এলাকায় বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ৫০ ফুট পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নসহ পানি ঢুকে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।গাইবান্ধায় বন্যা
গাইবান্ধা পৌর মেয়র অ্যাড. শাহ মো. জাহাঙ্গীর কবীর মিলন বলেন, ‘বাঁধ ভেঙে গত দুইদিন পৌর এলাকার কয়েকটি ওর্যাডে পানি ঢুকে পড়ে। কিন্তু বুধবার সকাল থেকে শহরের চারপাশে থাকা পানি পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করে। এতে বাসাবাড়ি ছাড়াও অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সড়ক পানিতে ডুবে যায়।’ শহরে বন্যার পানি উঠায় পৌরবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
দুর্গত এলাকার লোকজন বলছেন, গত সাতদিন ধরে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগির সঙ্গে একই জায়গায় দিন কাটছে তাদের। বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু জায়গা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন তারা। কিন্তু সেখানেও রান্নাবান্না করা এবং পায়খানা-প্রস্রাব করার তেমন ব্যবস্থা নেই।বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে গাইবান্ধা শহরেও
তাদের অভিযোগ, দুর্গত এলাকার মানুষের মাঝে সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও তা একেবারেই অপ্রতুল।আবার চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় এখনও ত্রাণ পৌঁছায়নি। কর্মহীন এসব মানুষের ঘরের খাবার শেষ হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ত্রাণ তৎপরতা রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জের বেলকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিলুল্লা ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, ‘ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষ চরাঞ্চলে বসবাস করেন। বন্যার পানিতে দুই ইউনিয়নের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ গত সাত দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত তাদের দুই ইউনিয়নের চার শতাধিক মানুষ সহায়তা হিসেবে চাল ও শুকনা খাবার এবং নগদ টাকা পেয়েছেন। পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা চেয়ে আবেদন করা হলেও এখন তা পাওয়া যায়নি। প্রতিদিনই বানভাসী লোকজন ত্রাণের আশায় তাদের কাছে ভিড় করছেন।’বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে গাইবান্ধা শহরেও
এ বিষয়ে গাইবান্ধা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ত্রাণ ও দুর্যোগ অধিদফতরের গাইবান্ধার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যা পরিস্তিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার পর্যন্ত দুর্গত এলাকার মানুষের মাঝে ৪০০ মেট্রিক টন চাল, ৪ হাজার শুকনা খাবার প্যাকেট ও নগদ সাড়ে ৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।’
ত্রাণের অপ্রতুলতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত আছে। নতুন করে আরও বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সংকট পরিস্থিতি মোকাবিলায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তবে লোকবল ও স্বেচ্ছাসেবীর অভাবে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগছে।’বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে গাইবান্ধা শহরেও
গাইবান্ধা জেলা সিভিল সার্জন এবিএম আবু হানিফ জানান, বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের জরুরি স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে ১০৯টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা করছে। ইতোমধ্যে ৬১টি মেডিকেল টিম দুর্গত এলাকায় কাজ করছে। দুর্গত এলাকায় এখন পর্যন্ত তেমন রোগবালাই ছড়ায়নি। তবে যাতে রোগবালাই ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য দুর্গতদের মাঝে প্রয়োজনীয় ঔষধ বিতরণ করা হচ্ছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৭ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার কিছুটা নিচে নেমেছে। এছাড়া তিস্তা নদীর পানি গত দুই দিন ধরে বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে করতোয়া নদীর পানি যে কোনও সময় বিপদসীমা অতিক্রম করবে।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান। তিনি বলেন, শহর রক্ষা বাঁধসহ বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

আরও পড়ুন- বন্যায় এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যু

/এসটি/এফএস/

লাইভ

টপ