শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে কুড়িগ্রামের পানিবন্দি ৬ লক্ষাধিক মানুষ

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ২২:১৮, জুলাই ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:২৯, জুলাই ১৮, ২০১৯

আশ্রয়ের খোঁজে চলেছেন তারাঘরে চাল আছে কিন্তু রান্না করার মতো কোনও স্থান নেই, ঘরের ভেতর কোমর সমান পানি। কোথাও সেই পানি ঘরের চাল ছুঁই ছুঁই। এ চিত্র এখন কুড়িগ্রামের ৫৬ ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক পরিবারের। সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হলেও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে মাত্র দুই হাজার প্যাকেট! শিশুসন্তান আর গবাদিপশু নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে বানভাসি পরিবারের ছয় লাখের বেশি মানুষ। নেই শৌচাগারের ব্যবস্থা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিলেও শুকনো খাবার আর বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে আছেন তারা। এর সঙ্গে রয়েছে গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট।

বন্যা দুর্গত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলাবদ্ধতায় কাজ না থাকায় এবং ঘরের সঞ্চিত খাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ত্রাণ সহায়তার ওপর। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাবার না পৌঁছানো হলে তাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব এলাকা, ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের বড়লই এলাকা, উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়ন ও চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাসহ ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানিতে প্লাবিত বন্যা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পানিবন্দি প্রতিটি পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে পানি প্রবেশ করায় এসব এলাকার অনেক মানুষ শিশুসন্তান ও গবাদিপশু নিয়ে নিকটবর্তী উঁচু সড়ক ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে।

চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ এবং উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের ওয়াপদা বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেওয়া কয়েকটি পরিবারের নারী সদস্যরা জানান, রাতের বেলা পোকামাকড়ের আতঙ্ক আর দিনের বেলা শিশুসন্তানদের পানিতে পড়ারে আতঙ্কে দিন কাটে তাদের। বাড়িতে কোমর সমান পানি ওঠায় সড়কের পাশেই দু’মুঠো চাল রান্না করে সন্তানদের পেটে দিচ্ছেন তারা। পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি থাকলেও সরকারি কোনও ত্রাণ সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন বানভাসিরা।

চিলমারীর রমনা ইউনিয়নের বাঁধে আশ্রয় নেওয়া সাবেরা বেওয়া, কছিমন, জাহানারাসহ কয়েকজন নারী অভিযোগ করে বলেন, ‘হামার ঘরত চকির (বিছানার) উপরা পানি, চুলা ডুবি গেইছে, টয়লেটের উপরা পানি। বাড়িত খাবার নাই, কেমন করি থাকি, কী খাই কাইয়ো খোঁজ নিবার আসিল না।’

এই নারীরা জানান, চারপাশে পানি থাকায় রান্না করা এবং শৌচ কাজ করা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রামীণ সড়কে আশ্রয় নিয়ে শিশু, বৃদ্ধ, গবাদিপশুসহ বেঁচে থাকার প্রয়াসভানভাসিদের অভিযোগ ও ত্রাণ সহায়তার স্বল্পতার কথা স্বীকার করে রমনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আজগার আলী সরকার বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি। আর আমি বরাদ্দ পেয়েছি ৪৮০ পরিবারের। আমার ইউনিয়নের বানভাসিদের জন্য কোনও শুকনো খাবার দেওয়া হয়নি। বরাদ্দ না পেলে কীভাবে দেবো?’ বানভাসিদের জন্য তার ইউনিয়নে কেবলমাত্র দুটি অস্থায়ী শৌচাগার দেওয়া হয়েছে বলে জানান এই চেয়ারম্যান।

এদিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব এলাকা এবং ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের বড়লই এলাকায় সড়কে আশ্রয় নেওয়া বানবাসী নারীরাও বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শৌচাগারের সংকটের অভিযোগ করেছেন।

চরবড়লই গ্রামের হাসিনা বেগম বলেন, ‘বাড়িত বুক থাকি পানি। ছাওয়াক নিয়া কোনওমতে পানি পার হয়া রাস্তাত আসি উঠছি। খাওয়ার কষ্টতো আছে, পানি আনি খাওয়া নাগে একমাইল দূরের বাজার থাকি। আর পায়খানা-প্রসাবের জায়গা না থাকায় মহিলারা খুব বিপাকে পড়ছি।’

চরবড়লই গ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য খইমুদ্দিন ব্যাপারী বলেন, ‘বন্যার অবস্থা খুব খারাপ। মানুষ খুব কষ্টে আছে। এলাকায় বিশুদ্ধ পানি আর টয়লেটের খুব অভাব। বিশেষ করে, নারী ও শিশুরা খুব কষ্ট ভোগ করছে।’

সরকারি ত্রাণ সহায়তা প্রসঙ্গে এই ইউপি সদস্য বলেন, ‘আমরা তালিকা করছি। তালিকা করে উপজেলায় জমা দিলে সে অনুযায়ী সহযোগিতা করা হবে।’

বানভাসিদের অভিযোগ ও দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল কাদের বলেন, ‘আমরা জনস্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ ও অস্থায়ী টয়লেট স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছি। যেসব এলাকায় এখনও ত্রাণ পৌঁছায়নি সেসব এলাকার সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।’

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয় উপজেলার বন্যাকবলিত ৫৬টি ইউনিয়নের ৪৯৮টি গ্রামের সোয়া ছয় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আর এসব পানিবন্দি মানুষের জন্য বৃধবার পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৫০০ মেট্রিক টন টাল ও নয় লাখ টাকা।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মো. হাফিজুর রহমান জানান, বন্যাকবলিত পরিবারগুলোর জন্য নয় লাখ টাকা জিআর ক্যাশ দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শুকনো খাবার কিনে দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে চার লাখ ৮৮ হাজার পরিবাকে দেওয়ার জন্য ভিজিএফ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা দ্রুত বিতরণ করা হবে। এছাড়াও বুধবার নতুন করে এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়ার কথা রয়েছে। বরাদ্দ পেলে সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ করা হবে।

 

/এমএএ/

লাইভ

টপ