কুমিল্লা মেডিক্যালে বিড়ম্বনা নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের স্ট্যাটাসে তোলপাড়!

Send
মাসুদ আলম, কুমিল্লা
প্রকাশিত : ২৩:০০, আগস্ট ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১১, আগস্ট ১৭, ২০১৯





ম্যাজিস্ট্রেটের সেই স্ট্যাটাসকুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে সেবার বিড়ম্বনা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক তালুকদার। বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। পরিচয় না দিয়ে গভীর রাতে কুমেক হাসপাতালে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গিয়ে তিনি বিড়ম্বনার শিকার হন। এ নিয়ে ওই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার ‘প্লাবন ইমদাদ’ ফেসবুক আইডিতে দুটি স্ট্যাটাস দেন, যেখানে বিড়ম্বনার নানা তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তার স্ত্রীর চিকিৎসাসেবা নিতে এসে বিড়ম্বনার শিকার হলে সাধারণ রোগীদের অবস্থা কী? এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের প্রথম শ্রেণির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক তালুকদার শুক্রবার (১৬ আগস্ট) সকাল ৬টা ৫৮ মিনিটে তার ফেসবুক ওয়ালে লেখেন, ‘রাত সাড়ে তিনটা। আমার স্ত্রীর হঠাৎ তীব্র পেট ব্যথা। ও চিৎকার করছিল। খুব ঘাবড়ে গেলাম। ইমার্জেন্সি অ্যাম্বুলেন্সের অনেকগুলো নম্বর নিয়ে কল করতে থাকলাম। কেউ কল ধরলো না। বড় বড় হাসপাতালের নম্বরে কল দিলাম। কেউ ধরলো না। অসহায় অবস্থায় বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে স্ত্রীকে নিয়ে হাঁটা দিলাম ফাঁকা রাস্তায়। কিছুদূর গিয়ে একটা সিএনজি অটোরিকশা পেলাম। গেলাম কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ইমার্জেন্সি তখন ঘুমাচ্ছে। অনেক কষ্ট করে ডিউটি ডাক্তার সাহেবের ঘুম ভাঙানো হলো। উনি কাগজে লিখে দিয়ে চার তলার ৪১৭ নম্বর ওয়ার্ডে যেতে বললেন। গেলাম। ওখানে ১৫ মিনিট কাউকে পেলাম না। অবশেষে এক সিস্টার বা আয়া এমন কেউ এলেন। জানলাম ডাক্তার সাহেব ঘুমাচ্ছেন। পাক্কা আধা ঘণ্টা ধরে দরজা নক করার পর উনি এলেন, দেখলেন। তারপর ব্যবস্থাপত্র লিখতে গিয়ে দুটি কলমই কালিশূন্য পেলেন। আবার গেলেন তার কক্ষে। গিয়ে ফিরলেন আরও ১০-১২ মিনিট পর। এদিকে, বেশ কয়েকজন রোগী জমে গেছে। অবশেষে আমার স্ত্রীর ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লিখলেন—এলজিন ইনজেকশন, নরমাল স্যালাইন আর খাবার স্যালাইন। মজার বিষয় হলো ডাক্তার সাহেব সঙ্গে অতিরিক্ত দুটি স্লিপ ধরিয়ে দিলেন। স্লিপ-১: সাতটি টেস্টের নাম। স্লিপ-২: বাদুরতলার শেফা ও আজাদ ক্লিনিকের নাম। মুখে বলে দিলেন, এই টেস্টগুলো যেন ওখান থেকেই করাই। অনেকটা আদেশের মতো। আমি ভেজা বিড়ালের মতো বললাম, জ্বি আচ্ছা। এর মাঝে কথা হলো দেবিদ্বার থেকে আসা এক ডেঙ্গু রোগীর স্বজনের সঙ্গে। তার একজন নারী রোগীর প্লাটিলেট কমেই চলেছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। কিন্তু মজার বিষয় হলো, রোগীর ওয়ার্ডে কোনও ডাক্তার নেই। ডাক্তার আসবেন সকালে অথবা আরও পরে। পরে আমার স্ত্রীকে নিয়ে চলে এলাম। ইনজেকশনটা একটা বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে পুশ করালাম।’
তিনি আরও লেখেন, ‘উপলব্ধি-১: গরিবের জন্য কোনও চিকিৎসা নেই। উপলব্ধি-২: ডেঙ্গু নিয়ে প্রান্তিক লেভেলে সরকারের নির্দেশনা কতটা ফলো করা হচ্ছে তা ভেবে দেখার আছে। উপলব্ধি-৩: আমাদের স্বাস্থ্য সেবা ২৪ ঘণ্টার নয় বরং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের (সরকারি/ বেসরকারি) দায়িত্বশীলদের মর্জি মোতাবেক নির্ধারিত সময়ে। উপলব্ধি-৪: অধিকাংশ বেসরকারি ক্লিনিক কেবল সকাল- সন্ধ্যা দোকান খোলে। ব্যবসা শেষে দোকান বন্ধ। রোগী জাহান্নামে যাক; যা আইনত দণ্ডনীয়। ক্লিনিকে অবশ্যই ইমার্জেন্সি ডাক্তার থাকা বাধ্যতামূলক। উপলব্ধি-৫: যত দায় আমাদের। রমজানে ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধ করো সকাল-সন্ধ্যা। রাত জেগে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা করো। ঘুম হারাম করে দুর্যোগ মোকাবিলা করো। ইলেকশনে টানা রাত জেগে কাজ করো। ঈদে নির্বিঘ্নে জনসাধারণের বাড়ি যাওয়া নিশ্চিত করো। জাতীয় দিবসের প্রস্তুতিতে নির্ঘুম রাত কাটাও। বিশেষ সংকটে জেগে থাকো রাতের পর রাত আর খেটে যাও সংকট মোকাবিলায়। মেডিক্যাল সেক্টরের জন্য করুণা। স্রষ্টা হেদায়েত দান করুন। আমিন।’
এদিকে, বিকালে আরও একটি স্ট্যাটাস দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক তালুকদার। এতে তিনি লেখেন ‘বিনা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় একজন এফসিপিএস ডাক্তারের মাধ্যমে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র করে নিয়েছি।’
প্লাবন ইব্রাহিম নামের এই ফেসবুক পেজ থেকে স্ট্যাটাস দেওয়া হয়সন্ধ্যার মধ্যে দুটি স্ট্যাটাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এ নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। চিকিৎসাসেবা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ফেসবুকে মন্তব্যের ঝড় বয়ে যায়। তবে শুক্রবার রাতে দুটি স্ট্যাটাস ফেসবুক থেকে প্রত্যাহার করে নেন ওই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
এ বিষয়ে কুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. স্বপন কুমার অধিকারী বলেন, ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের স্ত্রীর চিকিৎসা নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের বিষয়টি দেখেছি। পরে সিসি টিভি ফুটেজ চেক করে দেখেছি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফেসবুকে লিখেছেন—ইমার্জেন্সি ঘুমায়। তা সঠিক নয়। সবাই জাগ্রত ছিল। তার প্রথম অভিযোগ সঠিক নয়, তাই পরেরগুলো আমলে নেওয়ার কারণ দেখি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীরা ডাক্তারের দেখা পাচ্ছে না এমন অভিযোগও সঠিক নয়। তারপরও এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক তালুকদার বলেন, ‘এটা কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নয়, আমি আমার স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তির শিকার হয়েছি, আমার উপলব্ধি থেকে কেবলমাত্র তা তুলে ধরেছি।’
হাসপাতাল পরিচালকের বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি হাসপাতালে প্রবেশের পাঁচ মিনিট আগের ফুটেজ সবাইকে দেখাক। তাহলে দেখা যাবে ইমার্জেন্সি কী অবস্থায় ছিল। আর চারতলায় যে ডাক্তারের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলাম তার বিষয়ে তিনি কী বলবেন? আমার সব অভিযোগ সঠিক।’

/আইএ/

লাইভ

টপ