রোহিঙ্গা শিশুদের অনিশ্চিত জীবন (ভিডিও)

Send
আবদুর রহমান, টেকনাফ
প্রকাশিত : ১১:৫২, আগস্ট ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০০, আগস্ট ২৫, ২০১৯






টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রায় পাঁচ লাখ শিশু রয়েছে। এদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। পালিয়ে আসার পর মিয়ানমারের নির্যাতন থেকে হয়তো তারা মুক্তি পেয়েছে, তবে বন্যহাতি, সাপের কামড় আর রাতের বেলা মানবপাচারের ভয় থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। ক্যাম্পের মধ্যে ন্যূনতম উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা হচ্ছে বটে, কিন্তু সীমিত পরিসরের মধ্যে শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর’র হিসাবে, কক্সবাজারের ৩৪টি শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করছে চার লাখ ৯৮ হাজার ৮৩২ জন রোহিঙ্গা শিশু। এর মধ্যে গত দুই বছরে রোহিঙ্গা শিবিরেই জন্মগ্রহণ করেছে প্রায় ৬০ হাজার।

ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসেন নূর খলিমা। ক্যাম্পে আরেকটি ছেলে সন্তান জন্ম দেন এই নারী। ত্রাণ সহায়তায় সংসার চললেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত তিনি। টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের খলিমা বলেন, ‘সন্তানদের নিয়ে খুবই হতাশায় থাকি সব সময়। ক্যাম্পের প্রতি ঘরে পাঁচ-ছয় জন শিশু রয়েছে। এদের বেড়ে ওঠা, ভবিষ্যৎ কী হবে—এই ভাবনায় উদ্বিগ্ন থাকি রাত-দিন। এখানে বেড়ে ওঠা শিশুরা পাচার হয় অনেক সময়। এজন্য আরও ভয় লাগে।’

ক্যাম্পগুলো পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় অধিকাংশ শিশুই জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহের কাজ করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বনরক্ষীরা তাদের অনেক সময় লাঠি দিয়ে আক্রমণ করে, অনেকে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়। পাশাপাশি বন্যহাতি আর সাপের ভয় নিত্যদিনের সঙ্গী। জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে কেউ কেউ ধর্ষণের শিকার হয়েছে।’

১০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশু নূর খালেক বলে, ‘একটা স্কুল আছে, সেখানে যাই। দুপুরে ফিরে আসি। স্কুলে আমার ভালো সময় কাটে। এরপর ঘোরাফেরা করেই সময় পার করি। মাঝে মাঝে খেলি।’

ইউএনএইচসিআরের মতে, এ বছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক বছরের নিচে শিশু ৩০ হাজার ৮৩৫ জন। মোট রোহিঙ্গা ৯ লাখ ১২ হাজার ৮৫২ জন। এর আগে ২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এক বছরের নিচে মোট রোহিঙ্গা শিশু ছিল ৩০ হাজার ৫০ জন। মোট রোহিঙ্গা আট লাখ ৯১ হাজার ৮৭৮ জন। মোট শিশুর মধ্যে বাবা নেই এমন শিশু সংখ্যা ৩৩ হাজার ৫৯৫ এবং মা নেই এমন শিশু রয়েছে এক হাজার ৭৯৬ জন।

রোহিঙ্গা শিশু (ছবি: কক্সবাজার প্রতিনিধি)ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন বলছে, তিন থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু প্রায় তিন লাখ। ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত চার থেকে ১৪ বছর বয়সী দুই লাখ ৮০ হাজার শিশু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার শিশু শিক্ষার বাইরে আছে। অন্যদিকে, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের ৯৭ শতাংশ কোনও শিক্ষার ছোঁয়া পাচ্ছে না। তারা অপরাধ, শিশুশ্রম, মানবপাচার ও বাল্যবিয়ের মতো ঘটনায় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছে ইউনিসেফ।

রোহিঙ্গারা বলছেন, মিয়ানমারে তাদের কোনও আইনি পরিচয় বা নাগরিকত্ব নেই। বাংলাদেশেও শিশুদের জন্ম নিবন্ধন করা হচ্ছে না। শিশুরা পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকটে রয়েছে। তাছাড়া অনেক শিশু মিয়ানমারে অত্যাচার দেখেছে এবং কোনও কোনও শিশু কখনও তাদের বাবা-মাকে দেখতে পাবে না। এ কারণে তাদের অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
ইউনিসেফের অর্থায়নে কোডেক পরিচালিত স্কুলের পরিদর্শক সঞ্জু রানি দত্ত বলেন, ‘লেদা ক্যাম্পে তার দায়িত্বে রোহিঙ্গা শিশুদের ১১টি স্কুল রয়েছে। সেখানে বার্মিজ, গণিত ও ইংরেজি পড়ানো হয়। গত ২০ মার্চ পর্যন্ত এসব স্কুলে এক হাজার ১৬৩ জন শিশু পড়াশোনা করেছে।’

টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘ভয়হীন এমন একটা পরিবেশে শিশুদের বেড়ে ওঠার কথা; যেখানে সবাই ভালোবাসা, আদর-যত্ন দিয়ে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়তা করবে। কিন্তু এর পরিবর্তে এমন একটা পরিবেশে তারা বেড়ে উঠছে, যা তাদের জীবন ব্যবস্থা বিচলিত করে।’

/আইএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ