ঐতিহ্য আর সম্প্রীতিতে সৈয়দপুরে পবিত্র আশুরা পালিত

Send
তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী
প্রকাশিত : ১৫:২৭, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৮, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

আজ মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্ব) পবিত্র আশুরা। কারবালার শোকাবহ ঘটনাবহুল এ দিনটি মুসলমানদের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সারাদেশের মতো নীলফামারীর বিহারি অধ্যুষিত সৈয়দপুর শহরে দিনব্যাপী নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে দিনটি। শিয়া ও সুন্নি উভয়মতের অনুসারীরা শান্তিপূর্ণভাবে দিনটি পালন করেন।

রেলওয়ে কারখানাকে কেন্দ্র করে বিট্রিশ আমলে দক্ষ জনবল হিসেবে হাজার হাজার মানুষকে ভারতের বিহার রাজ্য থেকে আনা হয় এ জেলায়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর এবং ৭১-এর পরও তারা বংশ পরম্পরায় সৈয়দপুর শহরে রয়ে যান। ঐতিহ্য অনুযায়ীও তাদের কাছে আশুরার গুরুত্ব অনেক। তাদের মধ্যে শিয়া, সুন্নি উভয় মতের অনুসারী থাকায় অনুষ্ঠান উদযাপনের তরিকাতেও রয়েছে ভিন্নতা।

আশুরা উপলক্ষে সেখানে শহরজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয় বড় বড় তোরণ। আলোকসজ্জা করা হয় হরেক রকমের বাতিতে। আলাদাভাবে ঈমামবাড়ায় ইমাম হোসেনের মাজারকে স্মরণ করে মিনারের মতো তাজিয়া নির্মাণ করা হয়। সেখানেও করা হয় আলোকসজ্জা। তালে তালে বাজানো হয় ড্রাম।

শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় চলে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা, তলোয়ার ও আগুনের বিভিন্ন ধরনের খেলা। শহরের গোলাহাট থেকে শোভাযাত্রা ও মিছিল বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে। এ সময় সবার পরনে ছিল কালো রংয়ের পোশাক। ঢোলের তালে তালে দুহাত দিয়ে সজোরে বুকে আঘাত করে। একই সঙ্গে মুখে উচ্চারিত হয় ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’। কেউবা অঝোর নয়নে কাঁদেন আর ইমাম হোসেনের মৃত্যর স্মরণে মাতম গীত গাইতে থাকে।

মাতমকারী দলের জালাল উদ্দিন (৫৫) জানান, ছুড়ি, ব্লেড এসব দিয়ে শরীর জখম করে রক্ত ঝরিয়ে মাতমের রীতি পালন করা হয়। তবে প্রশাসন থেকে এবারে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় হাতিখানা কবরস্থানের কাছে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জায়গার মাঝে নির্মাণ করা হোসেনের কল্পিত মাজার, যা কারবলা নামে পরিচিত। সেখানে দুলদুল ঘোড়ার আদলে সাজা পাইকরা কারবলায় মান্নত করা পোশাক খুলে ফেলেন।
ঈমামবাড়া কমিটির সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন পাপ্পু (৫৫) বলেন, ‘আলোচনা ও দোয়া মাহফিল শেষে প্রিয় নবী (সা.) এর দৌহিত্র হাসান ও হোসেন (রা.) এর জীবনী আলোচনা করে তাদের রেখে যাওয়া পথ অনুসরণের মাধ্যমে মুসলিম জাতির ইহ ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য উপস্থিত সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।’ তিনি এসময় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে মহররম তথা পবিত্র আশুরা পালনের জন্য অনুরোধ জানান।

আয়োজক কমিটির সভাপতি, সহিদ হোসেন চিশতী (৬৫) জানান, মহররমের ৭ তারিখে কারবলা থেকে কিছু মাটি আনা হয়। বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী সে মাটি একটি পাত্রে করে তাজিয়ার নিচে সংরক্ষিত রাখা হয়। এর পর তাজিয়াকে কেন্দ্র করে চলে অন্যান্য রীতিনীতি পালন। শহরজুড়ে দর্শনার্থীরা দেখতে আসেন, দোয়া পড়েন, ভক্তি করেন। ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন মাটি যেখান থেকে আনা হয়েছিল সেখানেই রেখে আসা হয়। সে মাটি রাখার জন্য যেতে হয় শোকাবহ মিছিল সহকারে। কারও কারও শরীর রঙিন রশি, জরির ফিতা এবং ছোট ছোট ঘুণ্টির মালা দিয়ে পেঁচানো। প্রত্যেকের মাথা সাদা ও সবুজ কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢাকা। হাতে লাল সবুজ আর সাদা রংয়ের পতাকা। হাজার হাজার লোকের মিছিলে প্রতীকী কারবলায় (সৈয়দপুর শহরে) তিল ধরনের জায়গা থাকে না।’

সৈয়দপুর থানা ওসি শাহজাহান পাশা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সকাল থেকে শহরের প্রতীকী কারবালা প্রান্তরে হাজার হাজার দর্শনার্থী ও ভক্তরা এসে জমায়েত হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শহরে ৪৬টি ঈমামবারা কমিটি রয়েছে। এখানে সাম্প্রদায়িক কোনও সংঘাত নেই। ফলে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে আশুরা। নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র্যা ব টহল দিচ্ছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তল্লাশি করা হচ্ছে। এ বছর সৈয়দপুরে আশুরায় কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা এখন পর্যন্ত ঘটেনি।’

/এআর/

লাইভ

টপ