চলার পথ বন্ধ করে কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর!

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ১৯:৫৮, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫১, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯




 কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভা এলাকায় ২নং ওয়ার্ডের পূর্ব নাওডাঙ্গা গ্রামের গুচ্ছগ্রাম নামে একটি আবাসনের ১৫টি পরিবারের চলাচলের পথ বন্ধ করে কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অসহায় পরিবারগুলোর শত অনুরোধেও কবরস্থানের ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজন প্রাচীর নির্মাণ বন্ধ করেননি। অভিযোগ রয়েছে, গুচ্ছগ্রাম থেকে পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের জন্যই এমনটা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে গুচ্ছগ্রাম আবাসনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামটির ১৫টি পরিবারের অর্ধশতাধিক লোকজনের চলাচলের একমাত্র পথটি বন্ধ করে পাশের কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজের তদারকি করছেন গুচ্ছগ্রামের জমিদাতার ছেলে আব্দুল গণির শ্যালক টুকু। সীমানা প্রাচীরের কাজ শেষ হলে পরিবারগুলোর বসতবাড়ি থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা জানান, মিনসির উদ্দিন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির ওছিয়ত অনুযায়ী তার ছেলেরা ১৯৮৭ সালে দুস্থ ভূমিহীনদের বসবাসের জন্য ৪৮ শতক জমি দান করেন। এরপর সৌদি সরকারের অর্থায়নে ওই জায়গায় ১৫টি পরিবারের জন্য গুচ্ছগ্রাম গড়ে তোলা হয়। তখন থেকে ওই ১৫টি পরিবার সেখানে বসবাস করছে। গুচ্ছগ্রাম সংলগ্ন কবরস্থানের পাশ দিয়ে তারা চলাচল করতো। পরে কবরস্থানের পাশের জমির মালিকদের অনুরোধ করে তারা চলাচলের পথটি কিছুটা প্রশস্ত করে নেন।

 তবে সম্প্রতি কবরস্থান ব্যবস্থাপনা কমিটি জেলা পরিষদ থেকে কবরস্থানের উন্নয়নের নামে বরাদ্দ নিয়ে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের চলাচলের একমাত্র পথটি বন্ধ করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করে।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ও মকবুল হোসেন জানান, তাদেরকে ওই জায়গা থেকে উচ্ছেদের উদ্দেশে চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে তারা যে পথ ব্যবহার করছে তা রাতারাতি বন্ধ করে দিয়ে গুচ্ছগ্রামের পরিবারগুলোকে উচ্ছেদে বাধ্য করে গৃহহীন করার পরিকল্পনা করেছে স্থানীয় একটি কুচক্রী মহল। এই ষড়যন্ত্রে গুচ্ছগ্রামের জমিদাতার পরিবারের লোকজনও জড়িত বলে অভিযোগ করেন তারা।

আবাসনের বাসিন্দা হালিমা ও আকলিমা বলেন,‘ আমরা গরিব মানুষ। মাইনষে জায়গা দিছে, সেই জায়গায় বসবাস করি। আমাদের রাস্তা যদি বন্ধ করি দেয়, তাইলে স্বামী-সন্তান নিয়া কেমনে বসবাস করি? ওনাদের কন, অন্তত একহাত জায়গা আমাদের রাস্তার জন্য ছাড়ি দেউক।’

জানতে চাইলে জমিদাতার ছেলে ও অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আব্দুল গণি জানান, ওই গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অনেক অভিযোগ। তারা বিভিন্নভাবে স্থানীয়দের বিরক্ত করে আসছে। তাদের ওই আবাসনে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপও হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তারা সেখানে থাকবে, নাকি থাকবে না সেটা তাদের বিষয়। কবরস্থান কমিটি যে সীমানা প্রাচীর তৈরি করছে তাতে আমাদের কিছু করার নেই।

তবে জমিদাতার ছেলে আব্দুল গণি ও কবরস্থান কমিটির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর জমিদার রায়। তিনি বলেন, ‘মূলত গুচ্ছগ্রামের পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশে তাদের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। আমরা অনেক নিষেধ করার পরও কমিটি এতে কর্ণপাত করেনি। এর জন্য জেলা পরিষদ দায় এড়াতে পারে না।’

সীমানা প্রাচীর নির্মাণে গুচ্ছ গ্রামের জমিদাতার পরিবারের সদস্যরাও ইন্ধন দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এই পৌর কাউন্সিলর।

 আবাসনে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপের বিষয়ে জমিদাতাসহ কবরস্থান কমিটির সদস্যদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এই পৌর কাউন্সিলর বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট অভিযোগ। এমন কোনও অভিযোগ থাকলে তা আমি জানতাম এবং এ নিয়ে অন্তত একট সালিশ বৈঠক হতো। আসলে তারা ওই পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করতে চাইছে বলে এমন অভিযোগ তুলছে।’

তবে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের বিষয়ে জানতে কবরস্থান কমিটির সভাপতি আব্দুল হাকিমের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেও দেখা মেলেনি। অন্যদিকে কবরস্থানের জমিদাতা মো. মজিবুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‌‘ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।’

জেলা পরিষদের অর্থায়নে কবরস্থান উন্নয়নের নামে অসহায় পরিবারের লোকদের চলাচলের রাস্তা বন্ধের বিষয়ে জানতে কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেয়া খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে জেলা পরিষদের টাকা নিয়ে কেউ উন্নয়নের নামে কারও রাস্তা বন্ধ করতে পারে না। আমি বিষয়টি তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবো।’

/টিটি/

লাইভ

টপ