হাবিপ্রবিতে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ইউজিসি’কে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর

Send
বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
প্রকাশিত : ০১:২০, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৩৪, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯

 

দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগের ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনি। এরই প্রেক্ষিতে গৃহীত পদক্ষেপ ও তথ্যাদি জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ইউজিসি।

জানা গেছে, গত ২ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবরে পাঠানো ইউজিসি’র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠির অনুলিপি ইউজিসি’র চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব (সিনিয়র সহকারী সচিব), সহকারী সচিব ও ইউজিসি’র সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের একান্ত সচিব ও ইউজিসি’র সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের বিষয়ে তথ্যাদি জরুরি ভিত্তিতে পাঠানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী গঠিত কমিটিকে সুপারিশ বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োক্যামেস্ট্রি ও কলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রমজান আলীর বিরুদ্ধে উপাচার্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।

জানা যায়, ২০১৮ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন প্রভাষক, ১৬ জন কর্মকর্তা ও ২২ জন কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলে অস্বচ্ছতা ও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটার অভিযোগ উঠে। সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি লিখিত, মৌখিক ও প্রদর্শনী ক্লাস পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও যোগ্য ও মেধাবীদের চাকরি দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ করেন সিনিয়র শিক্ষকরা।

অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নাম প্রস্তাবের মাধ্যমে শিক্ষকদের রাখার নিয়ম থাকলেও উপাচার্য তার মনমতো শিক্ষকদের দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। প্রভাষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে ও প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে মর্মে দ্বিমত পোষণ করেন খোদ প্রভাষক (উদ্যানতত্ব) নিয়োগ কমিটির সদস্য ও হাবিপ্রবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শরীফ মাহমুদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ জন কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ার গোপনীয়তার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠে। ১৬ জন কর্মকর্তা নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও ২২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের সভাপতি প্রফেসর ড. বলরাম রায়, সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশীদসহ অন্যান্য সিনিয়র শিক্ষকরা। তারা অভিযোগ করেন- বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের পাশাপাশি জামায়াত-শিবির পরিবারের সদস্য এবং হত্যা মামলার আসামিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগে বোর্ডে সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধ্যাপকদের না রেখে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ এবং পরিচিতদের রাখা হয়।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ কোনও কোটা সংরক্ষণ করা হয়নি। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে কেউ মুক্তিযোদ্ধা কিংবা অন্য কোনও কোটার সন্তান নেই বলে দাবি করা হয়।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সেকশন কর্মকর্তা পদে চার জন নিয়োগ দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও দেওয়া হয়েছে পাঁচ জনকে। একইভাবে একাউন্ট কর্মকর্তা পদে একজনের জায়গায় নেওয়া হয়েছে দু’জন, স্টেট কর্মকর্তা পদে একজনের জায়গায় চারজন নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশীদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ যাবতীয় অনিয়মের ব্যাপারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকবে না।

এদিকে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে শিক্ষক রমজান আলীর বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন ওই ছাত্রী ও রমজানের স্ত্রী। তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত যৌন নির্যাতন অভিযোগ গ্রহণকারী কমিটিকে তদন্তভার দেওয়া হয়। সাত সদস্যের কমিটি রমজান আলীর বিরুদ্ধে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির প্রমাণও পায় তদন্ত কমিটি। এরই প্রেক্ষিতে কমিটি রমজান আলীর বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বহিষ্কার এবং যতদিন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শাস্তির বিধান নিশ্চিত না করছে ততদিন সাময়িক বহিষ্কারের সুপারিশ করে।

রিজেন্ট বোর্ডের সভায় ওই শিক্ষককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও গত এক বছরে পাঁচটি রিজেন্ট বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সভায় রমজান আলীর স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়নি।


পরে ওই শিক্ষকের বহিষ্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা রমজান আলীকে বহিষ্কার না করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের গাফিলতি ও মদদের অভিযোগ করেছেন।

মহিলা পরিষদের সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির সদস্য কানিজ রহমান বলেন, ‘ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় জন্য দায়ী একজন শিক্ষককে বাঁচানোর জন্য প্রশাসন উঠেপড়ে লেগেছে।’ এই ঘটনার জন্য অভিযুক্ত শিক্ষককে বহিষ্কারের পাশাপাশি তাকে বাঁচানোর জন্য জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ডা. ফজলুল হক বলেন, ‘কয়েকদিন আগে একটি চিঠি পেয়েছি। চিঠিতে কোনও সময়সীমা উল্লেখ নেই, তবে যত দ্রুত সম্ভব সেটি দেওয়া যায় তার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি কাজে ব্যস্ত আছি, পদক্ষেপের ব্যাপারে পরে জানানো হবে। ’

এ ব্যাপারে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মু. আবুল কাশেমের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

/এআর/

লাইভ

টপ