নতুন ভিডিও, রিফাতকে হাসপাতালে নেন মিন্নিই

Send
সুমন সিকদার, বরগুনা
প্রকাশিত : ০০:১৫, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:১২, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯





রিফাত শরীফকে হাসপাতালে নিয়ে যান মিন্নিবরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের নতুন একটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। বরগুনা সদর জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশদ্বারের একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ফুটেজে দেখে গেছে, রিফাত শরীফকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে আহত করার পর, তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি একাই তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এসময় মুমূর্ষু স্বামীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা যায় তাকে।
সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পাওয়া নতুন এই সিসিটিভি ফুটেজ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের সামনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ও বরগুনা জেলা পুলিশের আলাদা দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। নতুন পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজটি এই দুটি ক্যামেরার যেকোনও একটির।

নতুন পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৬ জুন সকাল ১০টা ২১ মিনিটে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান রিফাত শরীফকে একটি রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন মিন্নি। এসময় সেখানে উপস্থিত এক যুবক রিকশার দিকে দৌড়ে যান। রিফাতের অবস্থা দেখে তিনি দৌড়ে হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে একটি স্ট্রেচার নিয়ে রিকশার পাশে আসেন। এর মধ্যে সেখানে উপস্থিত অনেকেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। রিফাত শরীফকে রিকশা থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর মিন্নি হাসপাতালের সামনে উপস্থিত একজনের ফোন নিয়ে কল দিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেন। তিনি হাসপাতালের ভেতরে চলে যান। এর কিছু সময় পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর ও চাচা আবু সালেহ হাসপাতালে আসেন।
ভিডিওটিতে আরও দেখা গেছে, সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হাসপাতালের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স আসে। এ সময় সেখানে রিফাত শরীফের বন্ধু মঞ্জুরুল আলম জন ও তার কয়েকজন বন্ধু হাসপাতালের সামনে আসেন। জন বেশ কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলেন। ১০টা ৪৪ মিনিটে অক্সিজেন ও দুটি স্যালাইন লাগানো অবস্থায় রিফাত শরীফকে স্ট্রেচারে করে ওই অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। ১০টা ৪৯ মিনিটে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ছেড়ে যায় অ্যাম্বুলেন্সটি।

এ ঘটনায় এর আগেও দুটি ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রথম ভিডিওতে দেখা যায়, ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা যখন রিফাত শরীফকে কুপিয়ে আহত করছিল তখন তার স্ত্রী আয়শা প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন স্বামীকে রক্ষার। এরপর ওই ঘটনায় দ্বিতীয় যে ভিডিওটি প্রকাশিত হয়, সেখানে রিফাতকে কলেজ গেট থেকে ধরে পূর্বদিকে নিয়ে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের পেছনে কিছুটা ধীরগতিতে আয়শার হেঁটে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে একটি মহল। এই সন্দেহের জের ধরেই মিন্নির শ্বশুর ঘটনার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে রিফাত হত্যায় মিন্নি জড়িত বলে অভিযোগ তোলেন এবং ওই ভিডিওর উদ্ধৃতি দেন। ১৬ জুলাই আয়শাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গ্রেফতার করা হয়। উচ্চ আদালত থেকে ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হয়ে বর্তমানে বাবার বাড়িতে আছেন মিন্নি।

রিকশা করে রিফাতকে হাসপাতালে নেন মিন্নিনতুন ভিডিও প্রসঙ্গে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘পুলিশ শুরু থেকেই প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশে আমার মেয়েকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। তাই পুলিশ এই ভিডিওটিকে প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি। আমি নিজেই একটি মাধ্যমে ভিডিওটি সংগ্রহ করি। এখানে সবাই স্পষ্ট দেখেছে রিফাতকে নিয়ে মিন্নি একাই হাসপাতালে এসেছিল। আমি শুরু থেকেই বলে এসেছি, আমার মেয়ে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। ষড়যন্ত্র করে তাকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।’
মিন্নির বাবা আরও বলেন, ‘আমার মেয়েকে ফাঁসানোর জন্য কলেজের সামনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করা হয়েছিল, আর হাসপাতালের সামনের এই ভিডিওটিকে আড়াল করা হয়েছিল। এখন সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার। আমার মেয়ে নির্দোষ।’

এ বিষয়ে মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, ‘নতুন যে ভিডিওটি পাওয়া গেছে সেটি আমিও দেখেছি। এতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, মিন্নি তার স্বামীকে রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তে কী আছে সেটা আমি এখনও দেখিনি। কারণ, আদালতে দেওয়া পুলিশের অভিযোগপত্রের কপি এখনও পাইনি। তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ যদি এই ভিডিওর বিষয় উল্লেখ না করে, তবে তদন্ত প্রতিবেদনটি ত্রুটিপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘অভিযোগপত্রের কপি পেলে আমরা আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবো।’

রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা মিন্নির বিরুদ্ধে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার যেসব তথ্য প্রমাণ পেয়েছি, তা আদালতে দাখিল করেছি। এখন নতুন করে কোনও ভিডিও বের হয়েছে কি না, সেটা আমাদের জানা নেই। তবে নতুন কোনও ভিডিও প্রকাশ হয়ে থাকলে আমরা সে বিষয়েও খোঁজ নিয়ে দেখবো।’ তিনি বলেন, ‘তদন্তে যেভাবে এসেছে আমরা বিষয়টি সেভাবেই দেখছি। এখানে কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসানো হচ্ছে না।’

গত ১৬ জুলাই সকাল পৌনে ১০টার দিকে মিন্নিকে তার বাবার বাড়ি বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা-মাইঠা এলাকা থেকে পুলিশ লাইনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়। এরপর দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে একই দিন রাত ৯টায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরদিন (১৭ জুলাই) মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে কয়েক দফা আবেদন জানালেও নিম্ন আদালতে জামিন মেলেনি মিন্নির। পরে একই মামলায় জামিন চেয়ে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন।

এরপর ১ সেপ্টেম্বর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মিন্নিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় পুলিশ। একইসঙ্গে ১ নম্বর আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মামলাটিতে এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে ছয় কিশোর অপরাধী শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে। এছাড়াও আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ জামিনে রয়েছেন দুজন।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি হামলাকারীদের সঙ্গে লড়াই করেও তাদের দমাতে পারেননি। গুরুতর আহত রিফাতকে ওইদিন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও পাঁচ-ছয় জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

ভিডিওটি দেখতে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/BanglaTribuneOnline/videos/2558645297534309/?v=2558645297534309

 

 

/আইএ/

লাইভ

টপ