মিন্নিকে ফাঁসাতেই আড়াল করে রাখা হয় হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, দাবি পরিবারের

Send
সুমন সিকদার, বরগুনা
প্রকাশিত : ০০:০০, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৬, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯

রিফাত শরীফকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিচ্ছেন মিন্নি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের নতুন সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যাওয়ায় তা মামলাটির তদন্তে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন মিন্নির স্বজন, আইনজীবীসহ জেলার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বরগুনা সদর জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশদ্বারের একটি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ফুটেজে দেখা যায়, দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে আহত করার পর রিফাত শরীফকে রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যান তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। মিন্নির পরিবারের দাবি, তাদের মেয়েকে ফাঁসাতেই এই ভিডিওটা এতদিন আড়াল করে রাখা হয়েছিল। তবে নতুন ভিডিও দেখেননি জানিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, রিফাত শরীফকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া মানে মিন্নি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়—এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। এদিকে, মিন্নির আইনজীবী ও বরগুনার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের দাবি, স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নি যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, নতুন ভিডিওতে সেটা সুস্পষ্ট।

গতকাল সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়,২৬ জুন সকাল ১০টা ২১ মিনিটে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান রিফাত শরীফকে একটি রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যান মিন্নি। এসময় সেখানে উপস্থিত এক যুবক রিকশার দিকে দৌড়ে আসেন। রিফাতের অবস্থা দেখে তিনি দৌড়ে হাসপাতালের ভেতরে গিয়ে একটি স্ট্রেচার নিয়ে রিকশার পাশে আসেন। এর মধ্যে সেখানে উপস্থিত অনেকেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। রিফাত শরীফকে রিকশা থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর মিন্নি হাসপাতালের সামনে উপস্থিত একজনের ফোন নিয়ে কল দিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেন। তিনি হাসপাতালের ভেতরে চলে যান। এর কিছু সময় পর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর ও চাচা আবু সালেহ হাসপাতালে আসেন। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে হাসপাতালের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স আসে। এসময় সেখানে রিফাত শরীফের বন্ধু মঞ্জুরুল আলম জন ও আরও কয়েকজন হাসপাতালের সামনে আসেন। জন বেশ কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলেন। ১০টা ৪৪ মিনিটে অক্সিজেন ও দুটি স্যালাইন লাগানো অবস্থায় রিফাত শরীফকে স্ট্রেচারে করে ওই অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। ১০টা ৪৯ মিনিটে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ছেড়ে যায় অ্যাম্বুলেন্সটি।

এ ভিডিও ফুটেজের ব্যাপারে মন্তব্য নেওয়ার জন্য রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি।

তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, ‘পুলিশ আমার মেয়েকে ফাঁসানোর জন্য হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজটি গোপন রেখে কলেজ গেটের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছিল। আমার মেয়ে নির্দোষ। খুনিদের আড়াল করতে আমার মেয়েকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার চেষ্টায় আছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বেশ কিছু জায়গায় আমি কথাও বলেছি। আশা করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে জনগণের সামনে আরও কিছু তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবো।’

মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম বলেন, ‘সদর হাসপাতালের সামনের ভিডিও ফুটেজটি আমি দেখেছি। মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচানোর যে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন, সেটা স্পষ্ট এই ভিডিওতে। আমাদের শুরু থেকেই মনে হয়েছে, মিন্নিকে একটি মহল ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা মিন্নিকে নির্দোষ প্রমাণ করে মুক্ত করতে সক্ষম হবো।’

বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, ‘কলেজ গেটে মিন্নির ধীরগতিতে হেঁটে যাওয়া নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল, হাসপাতালের ভিডিওটি প্রকাশ হওয়ার পর তা দূর হয়ে গেছে। রিফাতকে কোপানোর সময় মিন্নির ভূমিকা ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও এটাই প্রমাণ করে, মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিন্নি যদি অপরাধী হয়, প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। কিন্তু কোনও মহল যদি মিন্নিকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর চেষ্টা করে, সেটা খুবই হতাশাজনক। আমাদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু পরিষ্কার করা হোক।’

এ ব্যাপারে বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির বলেন, ‘রিফাত হত্যা মামলাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য-প্রমাণই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছি।’ সদর হাসপাতালের ভিডিওটি অভিযোগপত্রের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণের জন্য যা যা উপস্থাপন করা দরকার, সবই করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নতুন যে ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে, সেখানে কী আছে—আমি জানি না। তবে হাসপাতালে রিফাতকে নিয়ে আসা মানেই মিন্নি হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। আমরা আদালতে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছি। আদালত সাক্ষীদের সাক্ষ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে যদি মিন্নিকে নির্দোষ রায় দেন, তবে তিনি খালাস পাবেন। আর যদি অপরাধী হন, তাহলে তার সাজা হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে এই মুহূর্তে এর বেশি আর কিছু বলতে চাই না।’

রিফাত শরীফকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিচ্ছেন মিন্নি

রিফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এর আগেও দু’টি ভিডিও ভাইরাল হয়। প্রথম ভিডিওতে দেখা যায়,২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা যখন রিফাত শরীফকে কুপিয়ে আহত করছিল তখন তার স্ত্রী আয়শা প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন স্বামীকে রক্ষার। এরপর ওই ঘটনায় দ্বিতীয় যে ভিডিওটি প্রকাশিত হয়,সেখানে রিফাতকে কলেজ গেট থেকে ধরে পূর্বদিকে নিয়ে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের পেছনে কিছুটা ধীরগতিতে আয়শার হেঁটে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে একটি মহল। এই সন্দেহের জের ধরেই মিন্নির শ্বশুর ঘটনার ১৮ দিন পর গত ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে রিফাত হত্যায় মিন্নি জড়িত বলে অভিযোগ তোলেন এবং ওই ভিডিওর উদ্ধৃতি দেন।

গত ১৬ জুলাই সকাল পৌনে ১০টার দিকে মিন্নিকে তার বাবার বাড়ি বরগুনা পৌর শহরের নয়াকাটা-মাইঠা এলাকা থেকে পুলিশ লাইনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসা হয়। এরপর দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে একই দিন রাত ৯টায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পরদিন (১৭ জুলাই) মিন্নিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে কয়েক দফা আবেদন জানালেও নিম্ন আদালতে জামিন মেলেনি মিন্নির। পরে একই মামলায় জামিন চেয়ে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন মিন্নি। তবে আদালতের নির্দেশে তিনি গণমাধ্যমে কোনও বক্তব্য দিতে পারছেন না।

এদিকে, গত ১ সেপ্টেম্বর রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মিন্নিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় পুলিশ। একইসঙ্গে ১ নম্বর আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মামলাটিতে এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে ছয় কিশোর অপরাধী শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে রয়েছে। এ ছাড়া, মিন্নিসহ জামিনে রয়েছেন দুইজন।

প্রসঙ্গত,গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি হামলাকারীদের সঙ্গে লড়াই করেও তাদের দমাতে পারেননি। গুরুতর আহত রিফাতকে ওইদিন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ ও পাঁচ-ছয় জনকে অজ্ঞাত আসামি করে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

/এমএ/টিএন/

লাইভ

টপ