নওগাঁর এক সিরিয়াল কিলার

Send
নাটোর প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২১:০৩, অক্টোবর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০১, অক্টোবর ২১, ২০১৯

বাবু শেখনওগাঁয় তার জন্ম। পেশা মাছ ধরে বিক্রি করা। নেশা মানুষ খুন করা। আর টার্গেট নারীরা। বিভিন্ন জায়গায় মাছ ধরা ও বিক্রির ছলে বাড়িতে একা থাকা নারীদের টার্গেট করে খুন করতো সে। ভিকটিম হয় মূলত নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত নারীরা। নাটোর, নওগাঁ ছাড়িয়ে টাঙ্গাইল জেলা পর্যন্ত এসে নারীদের খুন করেছে আনোয়ার ওরফে আনার ওরফে বাবু শেখ ওরফে কালু (৪৫)।

নাটোর ডিবি পুলিশের ওসি সৈকত হাসান জানান, রবিবার সন্ধ্যায় বাবু শেখ আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। সে আট নারীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, শ্বাসরোধে হত্যার পর বাড়িতে থাকা টাকা, স্বর্ণালঙ্কার যা পায় তা নিয়েই পালিয়ে যেতো সিরিয়াল কিলার বাবু শেখ। কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগে সে ভিকটিমকে ধর্ষণও করেছে। গত ১৯ অক্টোবর নাটোর শহরের রেলস্টেশন এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে নাটোর জেলা পুলিশ। এর আগে তার তিন সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের রাজশাহী বিভাগীয় ডিআইজি একেএম হাফিজ আক্তার রবিবার নাটোর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বাবু শেখের বাড়ি নওগাঁ জেলার রাণীনগর থানার হরিশপুর গ্রামে। তার বাবার নাম জাহের আলী। বাবু শেখের সহযোগী রুবেল আলী (২২), আসাদুল (৩৬) ও তার ভায়রা শাহিন(৩৫)। এছাড়া একেকটি হত্যাকাণ্ডের পর পাওয়া স্বর্ণালঙ্কার কিনে নিতো শহরের লালবাজার এলাকার স্বর্ণ ব্যাবসায়ী লিটন খাঁ (৩০)। বাবুর সব সহযোগীকেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, একের পর এক চুরি করার কারণে বাবু শেখকে এলাকাবাসী গ্রামছাড়া করে। এরপর বাবু শেখ ও তার তিন সহযোগী জেলে সেজে বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরে বিক্রি করতো। এর আড়ালে সে খোঁজ নিতো এলাকায় কোনও নারী একা বাড়ি থাকে কিনা, আশপাশে কে থাকে, বাড়িতে কীভাবে ঢুকতে হবে ইত্যাদি। এরপর সহযোগীদের নিয়ে টার্গেট করা বাড়িতে ঢুকতো এবং টার্গেট করা নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করতো। পরে ঘরে থাকা টাকা, স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নিতো। টার্গেট করা এক স্কুলছাত্রীকে হত্যার আগে ধর্ষণও করেছে বাবু।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, আদালতে এ পর্যন্ত আটটি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে বাবু শেখ। এরমধ্যে নাটোর জেলায় পাঁচটি, নওগাঁয় একটি আর টাঙ্গাইল জেলায় দুটি।

হত্যাকাণ্ডের শিকার নারীদের মধ্যে একজনের বয়স ১৩ বছর, একজনের ৩২, দুই জনের ৪৫, একজনের ৫৮ ও দুইজনের বয়স ৬০ বছর।

এ পর্যন্ত নাটোর জেলায় লালপুর উপজেলার চংধুপইল এলাকার সাবিনা পারভীন ওরফে সাহেরা (৩২), বাগাতিপাড়া উপজেলার জয়ন্তীপুরের রেহেনা বেগম (৬০), নলডাঙ্গা উপজেলার বাঁশিলা পূর্বপাড়ার আমেনা বেওয়া (৫৮), খাজুরা মোল্লাপাড়ার স্কুলছাত্রী মরিয়ম খাতুন লাবণী (১৩) ও সিংড়া থানার বিগলবাড়িয়া এলাকার বৃদ্ধা শেফালী বেগম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

পুলিশ জানায়, নওগাঁ জেলার সদর থানায় ২০০৭ সালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডটি তার নেতৃত্বে হয়, যার রহস্য ইতোমধ্যেই উদঘাটিত হয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইল জেলার মীর্জাপুর থানার বাঁশতৈল গ্রামের রূপবানু (৪৫) ও একই জেলার সখিপুর থানার তক্তারচালা এলাকার সমলাকেও (৬০) হত্যা করে বাবু শেখ।

গত ৮ অক্টোবর রাতে লালপুরের চংধুপইলে সাবিনাকে হত্যা করে তার স্বর্ণের চেইন, কানের দুল ও একটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায় বাবু ও তার সহযোগীরা। এরপর বাগাতিপাড়ার জয়ন্তীপুরে রেহেনা বেগমকে হত্যা করে ১৬ হাজার টাকা নিয়ে যায় তারা। এই মামলার সূত্র ধরে জেলা পুলিশ মাঠে নামে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫ অক্টোবর সিংড়া থেকে রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যমতে একই দিন সন্ধ্যায় লিটন খাঁর দোকান থেকে লালপুরের ঘটনায় চুরি হওয়া স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা শেষে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আসামি লিটন ও রুবেলের দেওয়া তথ্যমতে পরের দিন নাটোর রেলস্টেশন এলাকা থেকে আসাদুলকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় একই জায়গা থেকে বাবু শেখকে গ্রেফতার করা হয়।

নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জয়ন্তীপুরে সিরিয়াল কিলার বাবু শেখের হত্যার শিকার রেহেনা বেগমের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাজ্জাদুল ইসলাম সোমবার রাত পৌনে ৮টার দিকে জানান, নাটোর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (নাটোর-২)-এর বিচারক সুলতান মাহমুদ বাবু শেখকে ২৩ অক্টোবর আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার বিকালে তিনি ওই আদেশনামা পেয়েছেন। ওইদিন হাজির হওয়ার পর আদালত তার বক্তব্য শুনবেন। এরপর আসামি বাবু শেখ, আসাদুল ও রুবেলকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে তিনি ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করবেন।

এদিজে লালপুর উপজেলার চংধুপইল এলাকার সাবিনা পারভীন হত্যা মামলার আইও ইন্সপেক্টর আকবর আলী জানান, তিনি এ ধরনের কোনও আদেশ পাননি। তবে আসামিরা সাবিনাকে হত্যার ব্যাপারে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলে তিনি জানেন।

/এফএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ