ছয় মাস ধরে ঘুম নেই নুসরাতের মায়ের চোখে (ভিডিও)

Send
রফিকুল ইসলাম, ফেনী
প্রকাশিত : ২৩:৫৫, অক্টোবর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪২, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

শিরিন আক্তারের চোখে গভীর বিষাদ ভর করে আছে (ছবি– প্রতিনিধি)

পাঁচ দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পোড়া যন্ত্রণা ভোগ করে না ফেরার দেশে চলে যান যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদের কারণে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। তার পোড়া যন্ত্রণা নিয়ে চলে যাওয়ার সেই স্মৃতি গত ছয় মাসে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি বলে জানিয়েছেন মা শিরিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘ঘুরেফিরে চোখের সামনে ভাসে ঝলসে যাওয়া নুসরাতের সেই বীভৎস ছবি; মেয়ের শরীরের পোড়া গন্ধ এখনও নাকে এসে লাগে। আমি ঘুমাতে পারি না।’


মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) বিকালে ফেনীর সোনাগাজী পৌর এলাকার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামে নুসরাতের বাড়িতে গেলে শিরিন আক্তারের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। গলার কাছে, বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে ওঠা যন্ত্রণা আড়াল করে মেয়ের স্মৃতিচারণ করতে থাকেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এই নারী। তবে ক্ষণে ক্ষণে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
শিরিন আক্তার বলেন, ‘সেই ঘটনা সারাক্ষণ মনে ভাসে, শরীর ভারী হয়ে আসে। চলাফেরা করতে পারি না। ওই ঘটনার পরপরই মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।’ তবে কোনও ডাক্তারের কাছে যাননি বলেও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) নুসরাত হত্যা মামলার রায়। এ ব্যাপারে শিরিন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি চাই, অভিযুক্ত প্রত্যেক আসামির সর্বোচ্চ সাজা হোক।’
শিরিন আক্তার বলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়েকে ঘাতকরা যেভাবে হাত-পা বেঁধে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, তেমন কঠিন সাজা যেন দেওয়া হয় অভিযুক্ত প্রত্যেক আসামিকে।’

নুসরাতের রুমে যখন-তখন হাউমাউ করে কাঁদেন শিরিন আক্তার  (ছবি– প্রতিনিধি)
নুসরাতের শয়নকক্ষে খাটের ওপর শুয়ে-বসে আহাজারি করেই সময় কাটে শিরিন আক্তারের। ঘোর লাগা চোখে তিনি বলেন, ‘রাতে তন্দ্রায় চোখ জুড়িয়ে এলে নুসরাতের মা মা ডাকে তন্দ্রা ছুটে যায়। তারপর আমার মেয়েটাকে খুঁজতে থাকি।’
নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, ‘নুসরাতের কক্ষে তার কাপড়-চোপড়, বইখাতা, আসবাবপত্র, সবই আছে; শুধু নেই আমার বোন। তার কক্ষে দিনের বেশিরভাগ সময় মা থাকেন। তিনি এ কক্ষেই নুসরাতকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতেন।’
নোমান আরও বলেন, ‘নুসরাতের খাটে রাতেও থাকেন মা। সারারাত দেখি, না ঘুমিয়ে জেগে আছেন। কোনও সান্ত্বনাতেও কিছু হয় না।’
নুসরাতের শয়নকক্ষের দেয়ালে লাল কাগজে লেখা ‘মা আমার চোখের মণি’। সেখানে মাকে নিয়ে দুই লাইনের একটা কবিতাও রয়েছে। একথা জানিয়ে নোমান বলেন, ‘আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যেন হয়।’
গত ১০ জুন আদালত মামলাটি আমলে নিলে শুনানি শুরু হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারিক আদালত। ২৭ ও ৩০ জুন মামলার বাদী নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানকে জেরার মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হয়। এরপর ৯২ সাক্ষীর মধ্যে ৮৭ জন সাক্ষ্য দেন আদালতে।

মা ও ভাইয়ের সাথে নুসরাত (ছবি– প্রতিনিধি)
আদালত সূত্র জানায়, ২৯ মে এ মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে ৮০৮ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই)। চার্জশিটভুক্ত ১৬ আসামির মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ৩০ মে মামলাটি ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। ১০ জুন আদালত মামলাটি আমলে নিলে শুনানি শুরু হয়। ২০ জুন অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বিচারিক আদালত।
প্রসঙ্গত, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে তিনি যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। এই ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে ওই মাদ্রাসার কেন্দ্রে যান নুসরাত। এসময় তাকে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যায়। এই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই বাদী হয়ে ৮ এপ্রিল সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

ভিডিও—

 

/এমএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ