ময়মনসিংহ সদরে খাসসহ ব্যক্তি মালিকানা জমিতে তৈরি হচ্ছে গুচ্ছগ্রাম

Send
আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত : ১২:৩৫, অক্টোবর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৮, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

ময়মনসিংহ সদরে নির্মিত গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প

ময়মনসিংহ সদরের খাগডহর চর বাহাদুরপুর গ্রামে সরকারের খাস খতিয়ানের জমিসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে গুচ্ছগ্রাম আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কৃষকদের অভিযোগ, তাদের তিন ফসলি জমিতে লাল নিশান টাঙিয়ে দখলে নিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে গুচ্ছগ্রাম আবাসন প্রকল্প। তাই চর বাহাদুরপুরের কৃষকদের কাছে প্রশাসনের ‘লাল নিশান’ এখন একটি আতঙ্কের নাম। 

তবে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ হাফিজুর রহমান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সরকারের খাস জমিতেই গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হচ্ছে। কারও ওপর কোনও চাপ সৃষ্টি করা হয়নি।’

এদিকে নোটিশ ছাড়াই ব্যক্তি মালিকানাসহ কৃষকদের পত্তনের জমিতে জবরদস্তি গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার সংগঠনের স্থানীয় নেতারা।

অন্যদিকে স্থানীয়রা জানান, কোনও ধরনের নোটিশ ছাড়াই খাস জমির সঙ্গে থাকা ব্যক্তি মালিকানাসহ পত্তনের জমিতে লাল নিশান টানিয়ে আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করছে উপজেলা প্রশাসন। বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও মামলার ভয়ে তারা এর প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। প্রতিবাদ করলেই ইউএনওর হাতে নাজেহালসহ চরম দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না বলে তারা জানান।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার শেখ হাফিজুর রহমান নিজেই এ প্রকল্পের ঠিকাদারি করছেন। সরকারের প্রায় চার কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাটি ভরাট থেকে শুরু করে টিনের ঘর তৈরির সব নির্মাণসামগ্রী কেনাকাটা করছেন তিনি। এ প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে অভিযোগ করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের তদন্তের দাবি করেছেন।

গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের নির্মাণ সামগ্রী

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার খাগডহর ইউনিয়নের দুলালবাড়ি মৌজার কৃষক ফজলুল হক (৩৫) জানান, কোনও ধরনের নোটিশ ছাড়াই প্রথমে তার ৩০ শতাংশ ফসলি জমিতে মাটি ভরাট করে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের ঘর তুলেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এর কয়েক মাস পর তার আরও ৯০ শতাংশ জমি লাল নিশান টাঙিয়ে জবরদখল করে নেওয়া হয়েছে। তার এই জমিতে তিন ফসল হতো। এই জুলুম বন্ধের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

তিনি আরও জানান, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ব্যক্তি মালিকানাসহ পত্তনের এই জমি জবর দখলের প্রতিবাদ করায় ইউএনও তার ভাতিজা ফারুককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যান। পরে অবশ্য এলাকাবাসীর চাপের মুখে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। প্রতিবাদকারীদের এভাবে নাজেহাল করা ছাড়াও নির্মাণসামগ্রী চুরির মামলায় জড়িয়ে পুলিশ দিয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়।

স্থানীয় কৃষক আব্দুস সালাম (৪৫) অভিযোগ করে বলেন, ‘সিএস, এসএ ও বিআরএস রেকর্ডে মালিকানাসহ নামজারি ও খাজনা পরিশোধের পরও তার ৫০ শতাংশ ফসলি জমি দখলে নিয়েছেন ইউএনও। প্রশাসনের হুমকি আর হয়রানির ভয়ে বাপ-দাদার জমি জবরদখলের জন্য তিনি কোনও প্রতিবাদ করতে পারছেন না।’

কেবল দুলাল বাড়ি মৌজাতেই নয়, পাশের কল্যাণপুর মৌজাতেও চলছে এই জবরদখল। কল্যাণপুর মৌজার কৃষক শাহাব উদ্দিন (৪৮) ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, খাস খতিয়ানের জমির সীমানা নির্ধারণ ছাড়াই কল্যাণপুর মৌজার ব্যক্তি মালিকানার জমিতে মাটি ফেলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কাছে লিখিত অভিযোগ করে কোনও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ময়মনসিংহ শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট এএইচএম খালেকুজ্জামান গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প বাস্তবায়নকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘প্রকল্পে কারও ব্যক্তি মালিকানাধীন রেকর্ডি জমি থাকলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। এই ক্ষেত্রে জবরদস্তি গ্রহণযোগ্য নয়।’

স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানায়, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে প্রায় ছয় একর জমিতে ২০০ ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। মাটি ভরাট ও ঘর নির্মাণ বাবদ এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শুরু হয়েছে। ২০২০ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা এ বছরের ডিসেম্বরে মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ভূমিহীন ২০০ পরিবার ২ শতাংশ হারে জমির ওপর পাবে একটি করে টিনশেড ঘর।

এ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে (পিআইসি) ইউএনও ছাড়াও রয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান, আরডিসি, এসিল্যান্ড ও পিআইও সদস্যরা। আর মাটি ভরাট কাজে ইউএনওসহ ইউপি চেয়ারম্যান খায়রুল আলম সোহাগ, ইউপি মেম্বার চান মিয়া, স্থানীয় ইমাম এনামুল হক, শিক্ষক তাসলিমা আনজুম ও সমাজসেবক সজীব−এই সাত জন সদস্য রয়েছেন। নওগাঁ ও পাবনার নির্মাণশ্রমিক দিয়ে এ প্রকল্পের কাজ করা হচ্ছে।

প্রকল্পের কাজ ইউএনও একাই করছেন বলে জানান প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির অন্য সদস্যরা। তবে ঠিকাদার নিয়োগ না দেওয়ায় ও  ইউএনও একাই সবকিছু করায় কাজের মান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জন সদস্য।

প্রকল্প কমিটির সভাপতি হিসেবে নিজেই সব কেনাকাটা করার কথা স্বীকার করে সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার শেখ হাফিজুর রহমান জানান, ‘সরকারের খাস জমিতেই গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্প করা হচ্ছে। কারও ওপর কোনও চাপ সৃষ্টি করা হয়নি।’

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শের মাহবুব মুরাদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনও অনিয়ম হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।

/জেবি/এমএমজে/

লাইভ

টপ