মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ০২:৩৮, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৪৮, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৫

croবাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়েছিল ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন। প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধও শুরু হয় রাজারবাগ থেকে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের ওই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে স্থাপিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। প্রতিদিনই জাদুঘরের সংগ্রহশালা বড় হচ্ছে। এর জন্য নির্মিত হচ্ছে দোতালা ভবন।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একযোগে আক্রমণ চালিয়েছিল ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে রাজারবাগেই বাঙালি পুলিশ সদস্যদের দ্বারা পাকিস্তানি সেনারা প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। একইসঙ্গে পুলিশ সদস্যরা বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে ঢাকা আক্রান্ত হওয়ার বার্তা সারাদেশের থানাগুলোতে প্রেরণ করেন। জানিয়ে দেওয়া হয়, তারা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। পুলিশের এই প্রতিরোধ যুদ্ধের কথা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়।
রাজারবাগ আক্রান্ত হওয়ার পরপরই ওয়ারলেস বা বেতারযন্ত্রের অপারেটর মো. শাহজাহান মিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে ইংরেজিতে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের বার্তাটি দেশের সব থানায় পাঠিয়ে দেন। ২৫ মার্চ তিনি তার বার্তায় বলেন, ‘বেইজ ফর অল স্টেশন্‌স অব ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, কিপ লিসেন অ্যান্ড ওয়াচ, উই আর অলরেডি এটাকড বাই পাক আর্মি। ট্রাই টু সেভ ইয়োরসেল্‌ভস, ওভার।’ রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বেতারযন্ত্রটির মাধ্যমে সারা দেশে এই বার্তা প্রচার করেন। এই জাদুঘরে সেই বেতারযন্ত্রটি স্থান পেয়েছে।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে প্রতিরোধ গড়ে প্রাণ হারান শতাধিক পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা। জাদুঘরে স্থান পেয়েছে একটি পাগলা ঘণ্টা, যেটি বাজিয়ে সেই রাতে পুলিশ সদস্যদের একত্রিত করছিলেন কনস্টেবল আব্দুল আলি। এছাড়া আরও রয়েছে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত রাইফেল, বন্দুক, মর্টারশেল, হাতব্যাগ, টুপি, চশমা ও ইউনিফর্ম। দেয়ালজুড়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের যুদ্ধের সময়ের ডায়েরি, হাতে লেখা বিভিন্ন বার্তা, বিভিন্ন ধরনের আলোকচিত্র এবং পোস্টার।

জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা ও  জাদুঘর প্রতিষ্ঠা কমিটির সভাপতি ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘২০০৯ সালের দিকে আমি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সদর দফতরের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার ছিলাম। বর্তমান আইজিপি তখন ডিএমপি কমিশনার ছিলেন। তিনি আমাকে পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের অবদান নিয়ে একটি প্রামণ্যচিত্র তৈরি করা উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমাদের এডিসি মোস্তাক আহমদ একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেটি তৈরি করতে গিয়ে শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্মারক সংগ্রহ করি। রাজারবাগে ২৫ মার্চ যে পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ তৈরি করেছিল তাদের সঙ্গে কথা বলি। এরপর রাজারবাগ পুলিশ লাইনের টেলিকম ভবনে প্রাথমিকভাবে সংগ্রহগুলো সংরক্ষণ করি। এতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরাও সহায়তা করেছেন।’

তিনি জানান, ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ জাদুঘরটি উদ্ভোধন করা হয়। জাদুঘরটি সবার জন্য ‍উন্মুক্ত। এখানে যেকেউ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের স্মারক দিতে পারেন। তা সানন্দে গ্রহণ করা হবে।

এসপি হাবিবুর রহমান বলেন, জাদুঘরের জন্য রাজারবাগে নতুন দোতালা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামি ২৬ মার্চ নতুন ভবনটি উদ্ভোধন করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কমিটির সদস্যসচিব পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবিদা সুলতানা বলেন, জাদুঘর তৈরি আগেও একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ নিয়ে কাজ শুরু হয়। তখন থেকেই ইতিহাস সামনে চলে আসে। পরবর্তীকালে জাদুঘর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যেখানে স্মৃতি স্মারক আর ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত। এর পরিদর্শন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ টাকা।

/এআরআর/বিএ/

/আপ: আরএ/

লাইভ

টপ