ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও সাতক্ষীরার উপকূলে প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়নের অনেক মানুষ জোয়ার-ভাটার মধ্যে বসবাস করছিলেন। বৃহস্পতিবার অমাবস্যার প্রবল জোয়ারের তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার লেবুবুনিয়, আশাশুনির উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন, শ্রীউলা এবং আশাশুনির সদর ইউনিয়নের দয়ারঘাট ও জেলেখালী এলাকা। এসব এলাকার নদীগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে গেছে রাস্তা-ঘাট। বিশেষ করে প্রতাপনগর ইউনিয়নের মানুষ তাদের শেষ আশ্রয়টুকু হারাতে বসেছেন। বৃহস্পতিবারের জোয়ারের পানির তোড়ে মৎস্য ঘের ভেসে গিয়ে কয়েক কোটি টাকার সোনা খ্যাত চিংড়ি মাছের ক্ষতি হয়েছে।
এখাকার মানুষের মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকূলীয় বাঁধ। শ্রীউলা ইউনিয়নের পুঁইজালা গ্রামের মাছ চাষী তরুন কান্তি সরকার বলেন, ‘আম্পানের সময় ইউনিয়নের অনেক এলাকায় পানি উঠলেও আমাদের এলাকায় পানি আসেনি। কিন্তু এবার নদীতে প্রবল চাপে আমাদের এলাকা পানি প্রবেশ করে মৎস্য ঘের, ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ষাটের দশকে উপকূলীয় এলাকায় যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল সেই বাঁধেই চলছে। ভরা কটাল ও মরা কটাল এর জোয়ারের পানির চাপ আসলে এগুলো কখনোই সইতে পারে না। কিছু দিন পর পর বাঁধ ভাঙে। স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে রিং বাঁধ তৈরি করে, আর পানি উন্নয়ন বোর্ড টাকা তুলে খেয়ে ফেলে। টেকসই বাঁধ ছাড়া এর কোনও স্থায়ী সমাধান নেই। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা বাঁধ চাই।’
গাবুরা ইউনিয়নের গাইনবাড়ি এলাকার মাহমুদুল হাসান বাদশা বলেন, ‘আম্পানে লেবুবুনিয়ার বাঁধটি ভেঙে এলাকার মধ্যে জোয়ার-ভাটার খেলা চলছিল। এলাকার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণের পর কিছুটা দিন শান্তিতে বসবাস করছিলাম। কিন্তু তার আর হলো কই। কতবার এই বাঁধ মেরামত করতে হবে বুঝতে পারছি না। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে বাঁধটি নরম হয়ে গিয়েছিল। নদীতে পানিও বেড়েছে এরইমধ্যে। পানির চাপে আবার বাঁধটি ভেঙে গ্রামের মধ্যে হু হু করে পানি ঢুকছে। ঝড়ে বা জলোচ্ছাসে গ্রাম প্লাবিত হলে এমপি-মন্ত্রীরা পরিদর্শনে এসে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়ে চলে যান। পরে আর তাদের খোঁজ থাকে না। এখানে টেকসই বাঁধ না দিলে কোনও কাজে আসবে না।’
প্রতাপনগরে ইউনিয়নের মিলন বিশ্বাস বলেন, ‘আম্পানের পর থেকে তিন মাস পানি ডুবে আছে এখানকার অনেক গ্রাম। রিং বাঁধের মাধ্যমে কয়েকটি পয়েন্টে পানি আটকানো গেলেও জোয়ারের অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির কারণে পানির নিচে তলিয়ে গেছে পুরো ইউনিয়ন। মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। কপোতাক্ষ এবং খোলপেটুয়া নদীতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দুই ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। স্রোতে প্রতাপনগরের গড়ইমহল কালভার্ট সংলগ্ন প্রধান পিচ ঢালা রাস্তা ভেঙে গেছে। কল্যাণপুর ক্লিনিক মোড় থেকে তালতলা বাজার পর্যন্ত সব রাস্তা ছাপিয়ে জোয়ারের পানি সব জায়গায় ঢুকে পড়েছে। ফলে ইউনিয়ন সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এই এলাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আম্পানের পর আজও ডুবে আছে কৃষি জমিগুলো। স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, গবাদিপশু, খামারিদের সবই ভাসিয়ে দিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি আম্পান। আজও জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে ভুক্তভোগী প্লাবিত এ অঞ্চলের মানুষের। মাথাগোঁজার ঘর ভেঙেছে শত শত পরিবারের। টং বেঁধে বসবাস করছে তারা। আজও বাধ্য হয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। মানবেতর জীবনযাত্রার যেন অন্ত খুঁজে পাচ্ছে না বানভাসী মানুষেরা। এর মধ্যে আবার নদীতে পানি বেড়ে এলাকায় পানি প্রবেশ করে প্রতাপনগরের মানুষ শেষ আশ্রয়ও হারানোর পথে। অনেক মানুষ এলাক ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্য এলাকায়।’
শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, ‘আম্পানে গাবুরার লেবুবুনিয়ায় বাঁধের তিন কিলোমিটার নদীতে বিলিন হয়ে যায়। এলাকায় জোয়ার-ভাটা চলছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে বাঁশ আর বস্তা ছাড়া তাদের কাউকে আমাদের সঙ্গে পাইনি। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে রিং বাধ দিয়েছিলাম। কিছু মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু সে বাঁধ তো টিকলো না। আমাবস্যার প্রবল জোয়ারের তোড়ে লেবুবুয়িনার রিং বাঁধে ৩০ মিটার ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে ২০০ মৎস্য ঘের এবং বাড়ি-ঘর ভেসে গেছে। সেনাবাহিনী এই বাঁধ তৈরির দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু তারা বর্ষকাল না গেলে কাজ শুরু করতে পারছে না। সেনাবাহিনী দায়িত্ব নিয়েছে বলে এখন পানি উন্নয়ন বোর্ড এই বাঁধের ধারে-কাছে আসছে না। দ্রুত সংস্কার করা না গেলে এবার পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হবে।’
তিনি আরও জানান, ষাটের দশকে এই বাঁধগুলো নির্মিত হয়েছিল। তারপর থেকে আসলে স্থায়ীভাবে বাঁধগুলো কখনোই সংস্কার করা হয়নি। যখন ভেঙে যায় তখন কোনোরকম ঢিলেঢালাভাবে এটি মেরামত করা হয়। এরপর আর কেউ খবর রাখে না।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ‘আম্পানের পানি সরেনি এখনও। এর মধ্যে আবারোও নতুন করে বাঁধ ভেঙে পুরো ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এতে নতুন করে ঘরবাড়ি, মৎস্য ঘের প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মানুষ কীভাবে পারবে? একটা ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার আঘাত। এখন আর বসবাস করার উপযোগী থাকলো না আমার ইউনিয়ন। আর পারছি না।’
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবু জর গিফারী বলেন, ‘এসব এলাকার নদীগুলোতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুট পানি বেড়ে বাঁধ ছাপিয়ে পানি উপচে পড়ছে। গাবুরা ইউনিয়নের লেবুবুনিয়া বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। আমি ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি। জিও ব্যাগ দিয়ে স্থানীয়দের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করেছে। আশা করছি খুব দ্রুত পানি আটকানো যাবে।’
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের বলেন, ‘গাবুরার লেববুনিয়া আমরা কাজ শুরু করেছি। আশা করছি খুব দ্রুত পানি বন্ধ করতে পারবো।’
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, ‘যে সব জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছিল তার মধ্যে দুই-তিনটি বন্ধ করেছি। ঠিকাদারসহ আমরা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কিছু কিছু এলাকায় সেনাবাহিনী কাজ করছে। এক জায়গায় দুই সংস্থার কাজ করা যায় না। সে কারণে আমরা কাজ করতে পারছি না। এরপরও মানবিক কারণে আমরা কাজ করছি। জি ব্যাগ, বস্তা ও বাঁশ দিয়ে সাহায্য করেছি।’








