বিনা দোষে ১৩ বছর কারাগারে কাটানো জবেদ আলী বললেন‘জেলখানার চার দেয়ালের ইট-পাথরই ছিলো আমার কান্নার সাথী’

Send
মো. আসাদুজ্জামান, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত : ১৯:৫০, মার্চ ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৮, মার্চ ০৫, ২০১৬

বিনা বিচারে ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন সাতক্ষীরার জবেদ আলী-১

আমার সাধ ছিল, স্বপ্ন ছিল মনে। কিন্তু সেই সাধ, সেই স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। যে দিনগুলি আমার জীবন থেকে  কেড়ে নেওয়া হয়েছে তা কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে? আমি কি ফিরে পাবো ফেলে আসা সেই অতীত। বিনা দোষে ১৩টি বসন্ত পার করেছি অন্ধকার কারাগারে। চোখের জলে বুক ভাসিয়েছি স্বজনদের কাছে পাওয়ার জন্য। পাখির খাঁচার মতো বন্দি ছিলাম চার দেয়ালের মধ্যে। জেলখানার চার দেয়ালের ইট-পাথরই ছিলো আমার কান্নার সাথী। পৃথিবীর আলো-বাতাস প্রাণভরে উপভোগ করার জন্য ব্যাকুল ছিলাম। কবে মুক্তি পাবো এমন আশায় গুনতাম প্রতিটি প্রহর। মুক্তির জন্য আমার জেলখানার উপার্জিত টাকা ব্যয় করেছি এভাবেই- বাংলা ট্রিবিউনের একান্ত সাক্ষাতকারে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার মৃত আমজেল বিশ্বাসের ছেলে জবেদ আলী (৫৯)।

উচ্চ আদালত থেকে খালাসের আদেশ হলেও সেই আদেশ কারাগারে না পৌঁছানোয় ১৩ বছর কারাভোগ করেন জবেদ আলী। বুধবার বিকালে চাঞ্চল্যকর এই আদেশ জজ আদালত থেকে কারাগারে পৌঁছানো মাত্রই যথাযথ কার্যক্রম শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

বিনা বিচারে ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন সাতক্ষীরার জবেদ আলী-৩

এক প্রশ্নের জবাবে জবেদ আলী বলেন, আমি ছিলাম একজন কৃষক। সামান্য কিছু কৃষি জমিও ছিলো। তাতে যে ফসল হতো তাতেই আমরা সুখে ছিলাম। কুঁড়ে ঘরে থাকলেও সেটি ছিল আমার স্বর্গ। কিন্তু হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ের মতো আমার সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। স্ত্রী ফরিদা বেগম মারা যাওয়ার পর দুই মেয়ে লিলি (৮) ও রেক্সেনাকে (৫) পাঠিয়ে দেই মামা আবুল কাশেম সরদারের বাড়িতে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যেদিন মেয়ে দুটিকে দেখার জন্য তার মামার বাড়িতে গেলাম সেদিনই বড় মেয়ে লিলি মারা যায়। তার শরীরে বিষাক্ত পয়জন পাওয়া যায়। এ ঘটনায় শ্যালক কাশেম সরদার বাদী হয়ে হত্যার অভিযোগ এনে তালা থানায় মামলা করেন।

তিনি বলেন, পৃথিবীতে কোনও বাবা তার মেয়েকে হত্যা করেছে এমনটা আমার জানা নেই। আমার সঙ্গে যে ভুল হয়েছে অন্য কোনও মানুষের সঙ্গে যেন এমন না হয়। আমি কাউকে দোষারোপ করবো না। আল্লাহ’র ওপর বিচার ছেড়ে দিলাম।

আদালতের আদেশ সম্পর্কে সরকারপক্ষের আইনজীবী সাতক্ষীরা আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট ফাহিমুল হক কিসলু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, শুনানি শেষে আদালত তাকে মুক্তির নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যার ভুল অথবা অবহেলার কারণে তাকে এতোদিন কারাভোগ করতে হলো আল্লাহ তাদেরও বিচার করবেন।’

বিনাদোষে একজন বিচার প্রার্থীর ১৩ বছর কারাভোগের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সাতক্ষীরা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওসমান গনি।

তিনি বলেন, খালাস পাওয়ার পরও ১৩ বছর কারাভোগের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

আদালতের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ১৯৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মানিকহার গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে মেয়ে লিলিকে (৮) বিষ খাইয়ে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার হন জোবেদ আলী। পুলিশ এই মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত (দ্বিতীয়) ২০০১ সালের ১ মার্চ জোবেদ আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। জবেদ আলী এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আপিলে ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ তিনি খালাস পান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিম্ন আদালতে পৌঁছালেও দীর্ঘ ১৩ বছরে তা যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়া এবং কারাগারে না পৌঁছানোয় মুক্তি পাননি কৃষক জবেদ আলী।

বিনা বিচারে ১৩ বছর কারাগারে ছিলেন সাতক্ষীরার জবেদ আলী-২

সম্প্রতি সাতক্ষীরা জজ আদালতের আইনজীবী জিললুর রহমান তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে জোবেদ আলীর বিষয়টি জানতে পেরে তার মুক্তির জন্য আদালতে আবেদন করেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বুধবার দুপুরে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা জজ আশরাফুল হক শুনানি শেষে জোবেদ আলীকে মুক্তির নির্দেশ দেন।

/বিটি/টিএন/

লাইভ

টপ