behind the news
Rehab ad on bangla tribune
 
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পিরোজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়েছিলেন শহীদ ফারুক

আরিফ মোস্তফা, পিরোজপুর২৩:৫৪, মার্চ ২৩, ২০১৬

শহীদ ওমর ফারুক১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পিরোজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন তদানীন্তন ছাত্রনেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক। স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস গ্রুপের এই ছাত্রনেতা ছিলেন পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আর এই অভিযোগেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর একটি রডের এক মাথায় সেই পতাকা বেঁধে আরেক মাথা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তার মাথায়। এমন নির্মমভাবে হত্যার পরেও দমেনি পাকিস্তানি হানাদাররা। অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের শিক্ষা দিতে তার দেহ ৩ দিন গাছের সঙ্গে লটকে রাখা হয়।  
ওমর ফারুকের জন্ম ১৯৫০ সালের ১২ মার্চ কাউখালী উপজেলার আমড়াজুড়ি গ্রামে। তার বাবার নাম মরহুম সৈয়দুর রহমান শরীফ। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের সময় ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন ওমর ফারুক। পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশ রক্ষার তাগিদ অনুভব করে কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগ দেন ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’ গ্রুপে। গড়ে তোলেন পিরোজপুর মহকুমা ছাত্রলীগ।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর সংগঠকের দায়িত্ব নিয়ে জড়ো করতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধাদের। পাকিস্তানি ট্রেজারি ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহও করেছিলেন। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ভারত যাওয়ার। তবে ২৯ মে স্বাধীন বাংলার পতাকাসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান তিনি। টর্চার সেলে চলে চরম নির্যাতন। কিন্তু ভেঙে পড়েননি ওমর ফারুক। এক সময় তার মনোবল ভেঙে দিতে তাকে বলা হয়েছিল ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি সে শ্লোগান না দিয়ে দিয়েছেন ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান। এ কারণে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে রাজাকাররা লোহার রডের সঙ্গে স্বাধীন বাংলার পতাকা বেঁধে তা  হাতুড়ি পেটা করে ওমর ফারুকের মাথায় ঢুকিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর বরিশালের টর্চার সেলে আটক থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের ‘শিক্ষা’ দিতে ৩ দিন গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় শহীদ ওমর ফারুকের লাশ।

বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী ও বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি (১৯৭৬-৭৭ সন) নূরদিদা খালেদ রবি শহীদ ফারুক সম্পর্কে জানান, পিরোজপুর শহরের তৎকালীন টাউন হল (বর্তমানে টাউন ক্লাব) মাঠে শহীদ মিনারের সামনে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ওমর ফারুক প্রথম উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলার পতাকা। এরপর তিনি ছাত্রদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

নূরদিদা খালেদ রবি বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বিকালে টাউন ক্লাব মাঠে সভা হয়। সভায় তৎকালীন এমএনএ অ্যাডভোকেট এনায়েত হোসেন খান, ডা. আ. হাই এমপিএ, ডা. ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল এমপিএ, আজিজুর রহমান হামদু শিকদার, অ্যাডভোকেট আলী হায়দার খান, এম.এ মান্নান, পিরোজপুর-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ একেএমএ আউয়াল, ওমর ফারুক, ছালাম সিকদার ও আমি (নূরদিদা খালেদ রবি) বক্তব্য দেই। সন্ধ্যায় আমরা সবাই মিলে পিরোজপুরের ট্রেজারি ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহ করি।’

ওমর ফারুক তখন বি.কম শ্রেণির ছাত্র এবং একই সঙ্গে মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ভিপি ছিলেন বলে জানান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর-৯ এর সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়া উদ্দিন বলেন,  ‘ওই সময়ে আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলাম। ২১ মার্চ আমি ছুটিতে পিরোজপুর শহরের পাড়েরহাট সড়কের (বর্তমানে শহীদ ফজলুল হক সড়কের) বাসায় আসি।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা

মেজর (অব. ) জিয়া উদ্দিন আরও বলেন, ‘পিরোজপুর ট্রেজারি থেকে অস্ত্র নিতে ওমর ফারুক অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। আমার ছোট ভাই কামাল ও মোদাচ্ছের আলী (প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা) ওই অস্ত্র থেকে ১২-১৪টি অস্ত্র নিয়ে এসে আমার কাছে দেয়। আমি রাতেই মসিদবাড়ি এলাকায় প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করি।’

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট এম এ মান্নান বলেন, ‘১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল ওমর ফারুক স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানা ও ঝালকাঠির কীর্তিপাশায় গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহে যান। এদিকে ২ মে পিরোজপুর ট্রেজারির কোষাগার লুট হয়। ৩ মে বরিশাল থেকে পাকিস্তানি বাহিনী এসে পিরোজপুর দখল করে নেয়। ট্রেজারি থেকে অস্ত্র নেওয়ার দায়ে ওমর ফারুকসহ তার সহযোগীদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হলে পিরোজপুরে প্রকাশ্যে চলার পথ বন্ধ হয়ে যায়। পিরোজপুরে না আসতে পেরে স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা মৌজে আলী মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেন ভারত যাওয়ার জন্য। ২৫ মে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বরিশাল যান। সেখানে ঠিকানা পেয়ে মাটিভাঙা হয়ে ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন ওমর ফারুক। ২৯ মে ১৯৭১ সকাল ৬ টায় বাউলাকান্দা ফেরার পথে এক সময়ে পিরোজপুরে কর্মরত পুলিশ সদস্য হানিফ তাকে চিনে ফেলেন এবং আলবদরদের সহায়তায় আটক করে প্রথমে তাকে বরিশাল কোতোয়ালী থানায় নিয়ে যায়। পরদিন (৩০মে ১৯৭১) তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বরিশাল ৩০ গোডাউনের টর্চার সেলে।

এম এ মান্নান আরও বলেন, ‘সহযোদ্ধাদের নাম এবং অবস্থান জানার জন্য তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। কিন্তু ওমর ফারুক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের কাছে হার মানেননি। তাকে বলা হয় যদি তিনি  ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেন তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ওমর ফারুক মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে অত্যাচার সহ্য করে চিৎকার করে বলেন ‘জয় বাংলা’।

ওমর ফারুকের মা কুলসুম বেগম ও বোন সালমা রহমান হ্যাপীপিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার (অর্থ) শহীদুল আলম মন্টু বলেন, ‘ওই নির্যাতন কক্ষে আটক থাকা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হক স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জানান, ১৯৭১ সালের ৪ জুন  হানাদার বাহিনী ওমর ফারুকের সঙ্গে থাকা ব্যাগ খুলে তল্লাশি চালিয়ে খুঁজে পায় ৭টি স্বাধীন বাংলার পতাকা। এ কারণে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে রাজাকাররা লোহার রডের সঙ্গে স্বাধীন বাংলার পতাকা বেঁধে তা ওমর ফারুকের মাথার মধ্যে হাতুড়ি পেটা করে ঢুকিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর বরিশালের টর্চার সেলে আটক থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের শিক্ষা দিতে ৩ দিন গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে শহীদ ওমর ফারুকের লাশ।’
শহীদ ওমর ফারুকের বোন পিরোজপুর মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সালমা রহমান হ্যাপী বলেন, ‘আমার মা কুলসুম বেগম এখন মৃত্যুশয্যায়। সুস্থ থাকার সময় তিনি কোনওদিন আমাদের ঘরের দরজা বন্ধ করতে দেননি। বলতেন, দরজা খুলে রাখ, ফারুক এসে ডাক দিবে। আর দরজা বন্ধ দেখলে সে কষ্ট পাবে।’
হ্যাপী আরও বলেন, ‘মায়ের নির্দেশে আমরা ভাইয়ের জন্য প্রতি বেলাতেই দু’মুঠো ভাত বেশি রান্না করতাম। মা বলত ফারুক কখন এসে বলে, মা ভাত দাও।’

দেশের জন্য ভাইয়ের যে ত্যাগ তা সবার স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়াম শহীদ ওমর ফারুকের নামে করার দাবি জানান হ্যাপী।

/এএ/টিএন/
/আপ: এইচকে/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ