Vision  ad on bangla Tribune

স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও সাতক্ষীরার রাজাকারদের বিচার হয়নি

মো. আসাদুজ্জামান, সাতক্ষীরা০০:৫৮, মার্চ ২৭, ২০১৬

ডায়মন্ড হোটেলের পেছনে রান্না ঘরের সামনে তোলা সেই ছবিযুদ্ধে ছিন্ন ঘরবাড়ি দেশ। মাথার ওপরে বোমার অভিযান। মায়ের কোলে আধমরা শিশু। এ কেমন বাঁচা। বেঁচে বেঁচে মরা। ’৭১ হ্যাঁ, ১৯৭১ এর কথা বলছি। সেদিন সবুজ বাংলা শহীদের রক্তে লাল হয়েছিল। সেদিন সাতক্ষীরাসহ বাংলাদেশের নদীগুলোতে কচুরিপানার মতো ভেসেছিল লাশ।
১৯৭১ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ শুনে বাঙালি জাতির শীতল রক্তে আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। ২৪ বছরের দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য কৃষক লাঙ্গল জোয়াল ফেলে হাতে তুলে নিয়েছিল কাতুর্জ, ছাত্রের হাত থেকে খসে পড়েছিল কলম, উঠেছিল স্টেনগান। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের অন্য সকল অঞ্চলের মতো সাতক্ষীরাতেও ছিল স্বাধীনতার পক্ষে প্রাণ উৎসর্গ করতে ঝাঁপিয়ে পড়া এক ঝাঁক তরুণ।
তেমনিভাবে ১ লাখ ৬৫ হাজার বর্গ মাইলকে যারা শ্মশান বানাতে চেয়েছিল সেই জলপাই রঙের ভিনদেশি বাহিনীকে যারা সাহায্য করেছিল তাদের সংখ্যাও কম নয়। জেলার মাটি ও পথের সঙ্গে অপরিচিত পাকিস্তানি বাহিনীকে সব ধরনের সহযোগিতা করতেও গড়ে ওঠে দালালদের সমন্বয়ে রাজাকার-আলবদর-আল -শামস-শান্তি বাহিনী।
বিজয়ের এই ৪৫ বছরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা যারা সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আমরা সাতক্ষীরায় সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার সঙ্গে জড়িত রাজাকারদের নৃশংসতার বিবরণ তুলে আনার চেষ্টা করেছি।
সারা দেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে এবং বিচারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে তখন সাতক্ষীরার যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের বিচার প্রশ্নে রহস্যজনক  নীরব রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে বিবেচিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল।

মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি দুর্লভ ছবি এই প্রতিবেদনের মূল উপজীব্য। ছবিটি ১৯ অগাস্ট সাতক্ষীরা শহরের তৎকালীন ডায়মন্ড হোটেলের পেছনে রান্নাঘরের সামনে রাজাকারদের উদ্যোগে তোলা। ছবিটির চিত্রগ্রাহক স্বাধীনতার পরপরই এটি মুক্তিযোদ্ধা ইমাম বারীকে প্রদান করেন। যা আজ একটি মহামূল্যবান দলিলে পরিণত হয়েছে।

এই ছবির ইতিহাস জানতে আমরা প্রথমেই কথা বলি সেই মহান মুক্তিযোদ্ধাদের একজনের সঙ্গে যাদের দলের ২ জনকে বুধহাটায় হত্যা করে বাকি ৫ জনকে রাজাকাররা আটক করে সাতক্ষীরায় এনে এই ছবিটি তুলেছিল।

এই ছবিতে থাকা (নিচে বসা বাম দিক থেকে প্রথম) ইমাম বারী সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়ার সন্তান। ১৯৭১ সালে যশোরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া অবস্থায় যুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধকালীন গঠিত বাংলাদেশ নৌ-কমান্ডের প্রথম ব্যাচের যোদ্ধা। তিন মাসের ট্রেনিং শেষে তাদেরকে ৪টি গ্রুপে ভাগ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য সাফল্য ‘অপারেশন জ্যাকপট’র জন্য পাঠানো হয়। মংলায় ৮টি জাহাজ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার পর ইমাম বারী ও তার দল ফিরছিলেন সাতক্ষীরার দিকে। পথিমধ্যে ১৭ আগস্ট  ১৯৭১ ভোর রাতে বুধহাটা বেতনা নদীতে তাদের নৌকা ঘিরে ফেলে আলিপুরের কুখ্যাত রাজাকার বাকীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী। নদীর দুই পাড় দিয়ে ক্রমান্বয়ে গুলি করতে থাকলে এক পর্যায়ে গুলি শেষ হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের। ফলে তাদেরকে আটক করতে সমর্থ হয়।

রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমাম বারী ৭১’ সালের সেই দুর্বিসহ স্মৃতি তুলে ধরেন বাংলা ট্রিউিবনের কাছে, প্রথমেই আব্দুল্লাহিল বাকী রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় উঠেই কোন কথা বলার আগেই তার কাছে থাকা থ্রি নট থ্রি রাইফেল তাক করে ৬ জনের মধ্যে সবচেয়ে সুঠামদেহী মুক্তিযোদ্ধা যশোরে আফতাফকে সরাসরি বুকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ আফতাফ আর্তনাদ করে নদীতে পড়ে ভেসে যায়। শহিদ আফতাফের লাশ আর পাওয়া যায়নি। এরপর আমাদের ৫ জনকে আব্দুল্লাহিল বাকীর দল চোখ বেঁধে নদীর পাড়ে একটি একতলা বাড়িতে আটকে রাখে। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাদের নিষ্ঠুর নির্যাতন চলতে থাকে। এরপর পলাশপোলের রোকনুজ্জামান খান এসে আমাদের দলের সিরাজকে জিজ্ঞাসাবাদ করল বাড়ি কোথায়। সিরাজ মনে করল তাকে তো হত্যা করবেই, সুতরাং ভুল ঠিকানা বললে তার পরিবারের সদস্যদের হয়তো আর খুঁজে পাবে না। অত্যাচারও করতে পারবে না। সিরাজ তার বাড়ি সুলতানপুর বলে জানালো। কিন্তু রোকন খান শহরের ছেলে হওয়ায় তার প্রকৃত ঠিকানা জানতো। ভুল ঠিকানা বলায় সিরাজকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গিয়ে বেড়িবাঁধের ওপর দাঁড় করিয়ে রাইফেল তুলে বুকে গুলি করলো রোকন খান। শহিদ হলেন সিরাজ।

এরপর রোকন একটি লাঠি দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি মেরে বলল তুইও আছিস এই দলে, আগে জানলে তো তোকেই মেরে ফেলতাম। এরপর কীভাবে যেন সাতক্ষীরায় পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে খবর যায় আমাদের আটক হওয়ার। ফলে আমাদেরকে একটি হলুদ রঙের গাড়িতে করে সাতক্ষীরা ডায়মন্ড হোটেলের টর্চার সেলে এনে আটকে রাখা হয়। পথিমধ্যে ধূলিহর থেকেও কয়েকজনকে তুলে আনা হয়। ডায়মন্ড (স্টার হোটেলও বলা হতো) হোটেলে আমাদেরকে পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। অনেককে ঘরে ঝুলানো হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হতো। এই হোটেলের অনেকগুলো রুমে অসংখ্য যুবতী মেয়েকেও আটকে রাখা হয়েছিল। যাদেরকে নিয়মিত ধর্ষণ করত পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকাররা। আমাদেরকে আনার ২ দিন পর ১৯ আগস্ট হোটেলের পেছনে রান্নাঘরের সামনে পায়ের কাছে বসিয়ে ছবিটি তোলা হয়। রাজাকাররা এলিট স্টুডিওর হামিদ ভাইকে ডেকে এনে ছবিটি তোলায়। আজ ছবিটি একটি দলিল।

তিনি আরো বলেন, আমাদেরকে আটকে রাখাকালীন একদিন খালেক মণ্ডল ও টিক্কা (জহুরুল) এসে কয়েকজন আটক মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে নিয়ে যায়। অন্য রাজাকাররা আমাদের জানায় তাদেরকে বিনেরপোতায় হত্যা করা হবে। এরপর একদিন আমাদেরকে যশোরে পাকিস্তানি বাহিনীর আস্তানায় পাঠানো হয়। যশোরের শংকরপুর যেখানে বর্তমানে বাসস্ট্যান্ড সেখানে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে একদিন ভোর বেলা যখন সৈনিকেরা প্যারেড করছিল তখন আমরা পালিয়ে আসি এবং পুনরায় যুদ্ধে যোগ দেই। সে আরেক ইতিহাস।’

গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কামরুজ্জামান বাবু বলেন,‘পাকিস্তানিরা অন্ধকারকে ভয় পেতো। সোনা ভাই বললেন পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দিতে পারলে পাকিস্তানি সেনারা অসহায় হয়ে পড়বে। আমরা যথারীতি তাই করি সফলতার সঙ্গে। পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দেওয়ার সপ্তাহ খানেক পরেই সাতক্ষীরা ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকসেনারা। আমরা যুদ্ধকালীন একাধিকবার খালেক মণ্ডল ও টিক্কা খান নামে কুখ্যাতি পাওয়া জহুরুল রাজাকারকে হত্যার জন্য অভিযান চালাই। কারণ বৈকারী-কাথণ্ডা অঞ্চল ও সাতক্ষীরা শহরে তারা অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল এবং অসংখ্য মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়া করেছিল। একদিন আমরা খবর পাই খালেক মণ্ডল তার বাড়িতে সকাল ৯/১০টার দিকে থাকবে। খবর পেয়ে আমরা তার বাড়ি ঘেরাও করি। ঘরের ভেতরে কাউকে না পেয়ে বিছানায় হাত দিয়ে দেখি বিছানা গরম, অর্থ কিছুক্ষণ আগেও সেখানে কেউ ছিল। আমরা কোথাও তাকে না পেয়ে ফিরে আসি। পরে জানতে পেরেছিলাম সে তার উঠানের একটি তালগাছে লাগানো বাঁশ বেয়ে উপরে লুকিয়ে ছিল। সেদিন যদি আমরা একবার আকাশের দিকে তাকাতাম শয়তানটা আর সাতক্ষীরাকে অশান্ত করার সুযোগ পেত না।’

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাসানুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণ হয়েও প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ শেষে আমাকে ভাড়–খালীতে সামশু ঢালীর দলে পাঠানো হয়। আমাদের এই দলটি অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করত। সীমান্তের এই অংশে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের প্রায়শই ছোট ছোট যুদ্ধ লেগে থাকত।’

তিনি বলেন,‘সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পিছনের যে গণহত্যা পাকিস্তানি বাহিনী ঘটিয়েছিল তা সম্ভব হয়েছিল বাকী, খালেক মণ্ডল আর রোকন খানের মত রাজাকারদের সহযোগিতায়। পাকিস্তানিরা সাতক্ষীরার কোনকিছুই চিনত না। তাদেরকে এই গণহত্যায় প্ররোচিত করেছিল এই রাজাকাররা। এদের বিচার অবিলম্বে শুরু হওয়া উচিত। বাকী, রোকনকে বাদ দিয়ে সাতক্ষীরার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব নয়। আমাদের চরম দুঃখের বিষয় ৭ ডিসেম্বর আমরা বাকী-রোকনদের ধরার জন্য সবরকম চেষ্টা করেও তাদেরকে ধরতে পারিনি। তারা তখন আত্মগোপনে ছিল। এছাড়া তৎকালীন আমাদের কিছু সিনিয়র রাজনৈতিক নেতার কারণেও অনেক রাজাকারকে আটক করেও আবার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। যা চরম ভুল ছিল। এরাই পরবর্তীতে সাতক্ষীরাকে মৌলবাদীদের ঘাঁটিতে পরিণত করেছিল।’

 কথা হয় সাতক্ষীরা শহরের পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দেওয়া বিখ্যাত অপারেশনের এক যোদ্ধা কামরুজ্জামান বাবুর সঙ্গে। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক সোনা’র নেতৃত্বে তারা সাতক্ষীরা পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দিয়ে সাতক্ষীরা ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীকে।

স্বাধীনতাযুদ্ধের এতো বছর পরও এইসব বীরসেনানীদের জীবদ্দশায় যদি বাকী, রোকন, খালেক মণ্ডল (জামায়াতের সাবেক এমপি তিনি এখন যুদ্ধপরাধের মামলায় আটক) টিক্কাদের বিচার করা না যায়, তাহলে আর কাদের সাক্ষ্য নিয়ে তাদের বিচার করা যাবে- এমন প্রশ্ন মুক্তিযোদ্ধাদেরই। এদেরকে অবিলম্বে বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনালের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

/বিটি/এমএসএম

samsung ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ