behind the news
Rehab ad on bangla tribune
 
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

হাসানুজ্জামানের ছাত্র থেকে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠার গল্প

মো. আসাদুজ্জামান, সাতক্ষীরা১৪:২৩, মার্চ ২৯, ২০১৬

১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার সোনার ছেলেরা। সেদিন হাত থেকে কলম ফেলে দিয়ে যেসব ছাত্র হাতে তুলে নিয়ে ছিলেন স্টেনগান, তাদেরই একজন হাসানুজ্জামান। ১৯৭১ সালে হাসানুল ইসলামের বয়স ছিল মাত্র ১৬ -১৭।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুজ্জামান বীরপ্রতীক-১

স্মৃতিচারণ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘কেবলমাত্র মেট্রিক পাশ করেছি, কলেজে ভর্তি হব এমন সময় পাক হানাদার বাহিনী সাতক্ষীরায় আক্রমণ করে। তখন আমরা পরিবারসহ পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া থানাধীন কাটিয়ায় আব্বার মামার বাড়িতে সপরিবারে আশ্রয় নেই।

আমি ছিলাম একটু দুরন্ত টাইপের। কখনও এক জায়গায় থাকতাম না। সেখানে মাহমুদপুরের জুলফিকার সিদ্দিকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। দুইজন মিলে ঠিক করি বশিরহাট আকাশ বাণী ভবনে মুক্তিযোদ্ধা বাছাই কেন্দ্রে গিয়ে নাম লেখাবো। যাচাই কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন আমিরুজ্জামান বাচ্চু ভাই। তিনি আমাদের টাকী যেতে নির্দেশ দিলেন। আমরা টাকী চিনি না। সেজন্য সেখানে থেকে যাই। পরের দিন সদর উপজেলার পায়রাডাঙ্গার বদরুল ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। তিনি আমাদের বলেন আমি টাকী ক্যাম্পে আছি। তোমরা আমার সঙ্গে যেতে পার। আমি ও জুলফিকারসহ অন্য ছেলেরা তার সঙ্গে টাকী চলে যাই। ওই ক্যাম্পটি ইউথ ক্যাম্প বলে পরিচিত ছিল। ওই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন শ্রদ্ধেয় ক্যাপ্টেন শাহাজান মাস্টার, হিরেন বাবু, আফজল হোসেনসহ বেশ কয়েকজন।

সেখানে গিয়ে এক ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হই আমরা। শত শত ছেলেকে কয়েকটি তাবু ও স্কুলের বারান্দাসহ পরিত্যক্ত কোনও বাড়িতে থাকতে হতো। খাওয়া দাওয়ার ভীষণ অসুবিধা ছিল।

সেখানে কিছুদিন থাকার পর আমাকে মেডিক্যাল প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে বাছাই করে অন্যদের সঙ্গে ভারতীয় ক্যাপ্টেন এপি সিপাহর পিপা ক্যাম্পে পাঠানো হয় আর জুলফিকার বিহারের চাফুলিয়ায় চলে যায়। পিপা ক্যাম্পে প্রায় দেড় মাস অন্য ছেলেদের সঙ্গে মেডিক্যাল ও সামরিক প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের ৮নং সেক্টর হেডকোয়ার্টার কল্যাণীতে পাঠানো হয়। ৮নং সেক্টর হেড কোয়াটারের কাছে পুলিশ ব্যারাকে হালকা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিয়ে হাকিমপুর অপারেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আমার সঙ্গে রফিক মাস্টার, আমিরুল, জুলফিকার, তপন দা, বমেন দা, নারায়ণ ভদ্র, দীনেশ প্রভাতসহ আরও অনেকে ছিল। আমরা কল্যাণী থেকে হাকিমপুর পৌঁছাই গভীর রাতে। তখন মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ চলছিল।

পরের দিন সকালে বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আতিয়ার ভাই ও আনসার কমান্ডার মরহুম এলাহী বক্স সরদারের সঙ্গে দেখা হয়। তারা আমাদের সাবধানে থাকতে বলেন। ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দীন আমাদের নিয়ে সম্মুখ ভাগে যাওয়ার জন্য ইপিআর সুবেদার মালেক সাহেবকে নির্দেশ দেন। এসময় ক্যাপ্টেন মাহবুব সাহেবকে সুবেদার মালেক বলেন, ‘স্যার এরা সম্মুখ যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে না। বরং ওদের সাহায্যে আমাদের অস্ত্র গোলা বারুদ সামনের দিকে নিতে হবে।’

উভয়পক্ষের প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে আমরা মিত্র বাহিনীর সঙ্গে ভাদলী কাকডাঙ্গার দিকে যেতে থাকি। এই যুদ্ধে কলারোয়ার আমজাদের বুকে গুলি লাগে। ভাগ্যক্রমে চিকিৎসায় সে বেঁচে যায় এখনও তিনি জীবিত আছে।

এখানে গেরিলা গ্রুপ কমান্ডার শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি রফিক, আমিরুল জুলফিকার ও আমাকে আমার নিজ এলাকায় নিয়ে আসেন। পরে আমাকে ভাড়খালী গেরিলা কমান্ডার সামছুর রহমান ঢালী গ্রুপে পাঠিয়ে দেন। সামছুর ভাই পূর্ব পরিচিত ছিলেন ঘোনা হাইস্কুলে একত্রে পড়তাম।

আমরা যে ১৩ জন সামছুর ভাইয়ের দলে ছিলাম তারা হলেন- সামছুর রহমান ঢালী কমান্ডার, আব্দুর রহমান, সহকারী কমান্ডার, মতিয়ার ফজল, হাসান, আব্দুল্লাহ, মফিজ, মজিবর, কাসেম সরদার, কাসেম রশিদ, আসাদুল, মুসা আমিন। ভাড়ুখালী খালের পশ্চিম পার্শ্বে আমাদের অবস্থান ছিল এবং খালের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে ঘোনা, মাহমুদপুর ও গাংনীতে পাক হানাদারদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। আমরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাজুক অবস্থায় ছিলাম। এখান থেকে আমরা প্রায়ই পাক বাহিনীর সঙ্গে খণ্ড খণ্ড গেরিলা যুদ্ধ করতাম।

শাহাদাৎ ভাইয়ের গ্রুপের মুক্তিযোদ্ধারা কামরুজ্জামান বাবু, সোনা ভাই, মালেক, আব্দুল্লাহ, আশু ও অরুণ অপারেশন করে সাতক্ষীরা পাওয়ার হাউস উড়িয়ে দিলে বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে পাক বাহিনীর মনোবল একেবারেই ভেঙে যায়।

৬ ডিসেম্বর আমরা আমাদের প্রতিরক্ষায় সতর্ক দায়িত্ব পালন করছিলাম। রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর যানবাহন যাওয়া আসা করছিল ও গাড়ির আলো আমাদের ব্যাংকারে এসে পড়ছিল এবং বিক্ষিপ্ত গুলির আওয়াজ শুনছিলাম। ইপিআর হাবিলদার চান মিয়ার একটি দল আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছিলেন।

হাবিলদার চান মিয়া আমাদের জানান ‘সাবধানে থাকতে হবে কিছু একটা ঘটবে।’ আমরা সারারাত জেগে ছিলাম। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারি পাকিস্তানি বাহিনী ঘোলা, মাহমুদপুর ও গাংনী থেকে রাতে পালিয়ে গেছে। আমরা অস্ত্রসহ দ্রুত মাহমুদপুরের দিকে রওনা দেই। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর জওয়ানরা ভোমরার দিক থেকে সাতক্ষীরায় আসতে থাকে। আনন্দে আমরা যখন মাহমুদপুরের দ্রুত যাচ্ছিলাম তখন ইপিআর ও মিত্র বাহিনীর বাঙালি সৈন্যরা আমাদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকে ‘এই মুক্তি তোমরা ওখানে দাঁড়ায়ে থাক নইলে মারা পড়ে যাবে।’ আমরা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি তারা এসে মাইন ডিরেক্টর দিয়ে এন্টি পারসনাল মাইন অপসারণ করে। আমার ও মুজিবরের দুপায়ের ফাঁক থেকে ২টি মাইন তুলে ফেলে। সেদিন নেহায়াত আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুজ্জামান বীরপ্রতীক-২

৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা সাতক্ষীরা থেকে যশোর ও খুলনার দিকে পালিয়ে যায় এবং সাতক্ষীরা আল্লাহর রহমতে মুক্ত হয়। আমরা তাদের পিছনে ধাওয়া করতে থাকি। এমনিভাবে চলতে থাকে আমাদের যুদ্ধ। এমনিভাবে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন দেশে পরিণত হয়।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৭৮ সালে আনসার বাহিনীতে থানা অফিসার হিসেবে যোগদান করেন হাসানুজ্জামান। ২০১৩ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন তিনি।

তিনি দুঃখ করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাতক্ষীরায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে কোনও স্মৃতিফলক নেই। যে ফলক রয়েছে সেটিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজাকার ও অমুক্তিযোদ্ধার নাম আছে। অথচ ১৭ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা -এ বি এম নাজমুল আবেদীন খোকন, মুনসুর আলী, আব্দুস সামাদ, আব্দুর রহমান, শাহাদাৎ হোসেন, আব্দুল ওহাব, গোলজার আলী, জাকারিয়া, নূর মোহাম্মদ, সোহরাব হোসেন, আবু দাউদ বিশ্বাস, নূল ইসলাম কারিগর, সুবেদার ইলিয়াস খান, আবুল কালাম আজাদ, ইঞ্জিনিয়ার আবুল কালাম আজাদ, মো. মোজাম্মেল হক ও মো. ইউনুস আলীর নাম স্থান পায়নি এ স্মৃতিফলকে। যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের কষ্ট দেয়।

/জেবি/টিএন/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ